৩৩৩ নাম্বারে কেন ফোন দেবে, এটা আমার জন্য ডিসক্রেডিট!

৩৩৩ নাম্বারে ফোন করা সেই ‘৪ তলা বাড়ি মালিকের’ জীবনে এই ঘোর অন্ধকার নামার নেপথ্যে ছিলেন ওই এলাকার স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার ও আওয়ামী লীগ নেতা আইয়ুব আলী। ৩৩৩ নাম্বারে ফোন করে সাহায্য চাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন থেকে তদন্তে আসা ব্যক্তিদের তিনিই প্রথম জানিয়ে ছিলেন- ফরিদ উদ্দিন ওই ৪ তলা বাড়ির মালিক এবং একজন ব্যবসায়ী।

শনিবার সেই ত্রাণ বিতরণের সময়েও আইয়ুব আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বলেছেন, ফরিদ উদ্দিন যথেষ্ট সচ্ছল। তার যদি ত্রাণের দরকার হয়ে থাকে তবে তাকে না জানিয়ে ৩৩৩ নাম্বারে ফোন দেয়াটা ছিল ‘ভুল ও অন্যায়’। এতে তার যথেষ্ট ‘ডিসক্রেডিট’ হয়েছে।

অপরদিকে ‘লঘু পাপ’ না করেও গুরু দণ্ডে দণ্ডিত ফরিদ উদ্দিনকে নিয়ে এখন বেশ ‘অস্বস্তিকর’ পরিবেশে পতিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা প্রশাসন। কথিত ‘৪ তলা বাড়ির মালিক’ শেষ পর্যন্ত ২ কামরার অসুস্থ ছাপোষা চাকরিজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পাশাপাশি তার বৃদ্ধ স্ত্রী আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছেলেকে দেখে তারা ‘হকচকিয়ে’ গেছেন।

খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা সেই ত্রাণ দিতে গিয়ে ফরিদ উদ্দিনের পরিবারকে বলেছেন, বিষয়টি তারা খুব ভালোভাবেই দেখবেন এবং ফরিদ উদ্দিনের ব্যাপারে ভ্রান্ত তথ্য দেয়া স্থানীয় মেম্বারের ব্যাপারেও প্রয়োজনে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

শনিবার বিকালে সরেজমিন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নাগবাড়ি শেষমাথা এলাকার গিয়ে দেখা গেছে, পিতার রেখে যাওয়া ভবনের ৩য় তলার এক পাশের ছাদে টিনশেডের ২টি ছোট্ট কামরায় একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন ফরিদ উদ্দিন (৫৭)। একটি হোসিয়ারি দোকানে চাকরি করে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে কোনোমতে চলে তার সংসার।

মাস তিনেক আগে ব্রেইন স্ট্রোক করে বাম চোখটির দৃষ্টিশক্তি হারানোর পাশাপাশি কথাবার্তাও খুব একটা গুছিয়ে বলতে পারেন না। কখনো কখনো দুপুরেই ভুলে যান সকালে কী বলেছেন। তাই সেই পুরনো দোকানেই মালিকপক্ষ মানবতার খাতিরে তাকে এখনো চাকরি করার সুযোগ দিয়েছেন ৮ হাজার টাকা বেতনে।

লকডাউনের কারণে সংসার আর নিজের চিকিৎসা নিয়ে বেশ বেগ পোহাচ্ছিলেন এই বৃদ্ধ। কিন্তু ৩৩৩ নাম্বারে প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য অনেক খাদ্য পাওয়ার আশায় ফোন করাটাই যেন কাল হলো তার। শনিবার বিকালে সরেজমিন দেখা গেছে, ফরিদ উদ্দিনের বাড়ির সামনের রাস্তায় শত মানুষের ভিড়। স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ুব আলীর নেতৃত্বে তার লোকজন ত্রাণ নিতে আসা মানুষদের লাইনে দাঁড় করানোর কাজে ব্যস্ত।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আসার কথা আছে বলে সেখানে চেয়ার-টেবিলও সাজিয়ে রেখেছেন আইয়ুব আলী। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো ত্রাণ সহায়তা তিনিই দিচ্ছেন। কিন্তু ওই বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা গেল ভিন্নচিত্র। সেই কথিত ৪ তলা বাড়ির মালিক ফরিদ উদ্দিন, তার স্ত্রী ও প্রতিবন্ধী এক কিশোরকে নিয়ে অসহায়ের মতো এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন।

কথা বলতে গেলে ভয়ে কিছুই বলছিলেন না। এরপর ফরিদ উদ্দিনের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী মূল বিষয়টি বলার পর মুখ খুললেন তারা। ফরিদ ও তার স্ত্রী হিরন বেগম জানালেন, প্রকৃতপক্ষে প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য সরকারের তরফ থেকে অনেক খাদ্য পাওয়ার আশাতেই ৩৩৩ নাম্বারে ফোন দিয়েছিলেন ফরিদ উদ্দিন। ফোন করার ২ দিন পর সেখান থেকে তার ঠিকানা জানা হয়।

এরপর গত বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন ইউএনও আরিফা জহুরাসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ফরিদ উদ্দিন বলেন, ইউএনও আমাকে বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলে আমি সত্যটাই বলেছি যে বাড়ির মালিক আমি। তিনি আমাকে বলেছেন আমি বৃদ্ধ মানুষ তাই জেল-জরিমানা দিলাম না। কিন্তু যেহেতু আমি সচ্ছল হয়ে খাবার চেয়েছি তাই ১০০ দরিদ্রকে আমাকে ত্রাণ দিতে আদেশ করেন।

তিনি বলেন, আমি ভয়ে রাজি হই কিন্তু সেই সময় আমার অবস্থাটা বলতে গিয়েও আমাকে স্থানীয় মেম্বার আইয়ুব আলী বলার সুযোগই দেননি। উল্টো ৩৩৩ নাম্বারে ফোন না করে উনাকে কেন জানালাম না সেজন্য ধমকাতে থাকেন। এসব কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন ফরিদ উদ্দিন ও তার স্ত্রী। এ সময় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তার প্রতিবন্ধী ছেলেটি।

ফরিদের স্ত্রী জানান, ১০০ লোকের ত্রাণ জোগাড় করতে গিয়ে আমাদের স্বর্ণালংকার বন্ধক রাখতে হয়েছে, ধার করতে হয়েছে। মেম্বার আইয়ুব আলীও আমাদের সুদে ১০ হাজার টাকা ধার দিয়েছেন। গত ২ দিন আমরা ইউএনও আপার কাছে যেতে চাইলেও মেম্বার আমাদের ভয় দেখিয়েছে যে ত্রাণ দেয়ার আদেশ না মানলে ৩ মাসের জেল হয়ে যাবে।

এদিকে সরেজমিন ফরিদ উদ্দিনের সেই ছোট ২ কামরায় গিয়ে দেখা গেল ২টি ভাঙাচোরা খাট আর পুরনো কয়েকটি আসবাব ছাড়া কিছুই নেই। এদিকে সেখানে থাকা স্থানীয় ইউপি মেম্বার আইয়ুব আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে কথা বলতে রাজি হননি। তবে বলেছেন, ফরিদ উদ্দিন একজন হোসিয়ারি ব্যবসায়ী, ৪ তলা বাড়ির মালিক। সে কেন ৩৩৩ নাম্বারে ফোন দেবে!

আর খাবারের দরকার হলে আমাকে বলতো, আমি স্থানীয় মেম্বার। এটাতো আমার জন্য ‘ডিসক্রেডিট’। তবে ফরিদ উদ্দিন প্রতিবন্ধী ছেলে নিয়ে কষ্টে আছেন- এমনটি তিনি জানলেন না কেন? এমন প্রশ্ন করার পর নিজের বক্তব্য তাৎক্ষণিক ঘুরিয়ে দেন আইয়ুব আলী।

তিনি বলতে শুরু করেন, আমি ইউএনও ম্যাডামকে বলেছিলাম ১০ জন লোককে ত্রাণ দেয়ার অবস্থাও ফরিদের নেই; কিন্তু ততক্ষণে কিছু করার ছিল না। অপরদিকে উপজেলা পরিষদের লোকজন তদন্তে আসার পর ৪ তলা বাড়ির মালিক কেন বলেছেন- এমন প্রশ্ন করলে আইয়ুব আলী উত্তর না দিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের ‘বাড়ি থেকে সরবত বানিয়ে এনেছি খান’ বলে সটকে পড়েন।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*