হাজারো নারী গুমরে কাঁদে!

ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো এখন আর সামাজিক নেই। এসব এখন অসামাজিক কার্যকলাপসহ ভ’য়ংক’র সব অপরাধ সংঘটনের প্ল্যাটফরমে পরিণত হয়েছে। টিকটক, লাইকি, নানা গে’ম অ্যাপ’সের ফাঁ’দে সর্বস্ব হা’রিয়েও জি’ম্মি থাকছে নারী-পুরুষ।

এসব নেট যোগাযোগের সূত্র ধরে পরিচিতি, অডিও, ভিডিও রেকর্ডসহ নানারকম ব্ল্যা’কমে’লিংয়ের নি’র্ম’ম শি’কার হ’চ্ছেন অনেকেই। দিনের পর দিন ব্যক্তি পর্যায়ে, কখনো সংঘবদ্ধ চ’ক্রের প্র’তা’রণামূলক নি’পীড়’নের মুখে অনেকের সং’সার ভে’ঙেছে, ধ্বং’স হয়ে গেছে তাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন। সীমাহীন য’ন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে অনেকে প্রাণ বি’সর্জন দিতেও বাধ্য হয়েছেন। তবে এর ফাঁদে সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারীরা।

কাউকে বলতে পারে না। একা নিভৃতে গুমরে কাঁদে এমন হাজারো নারী। সংশ্লিষ্টরা বলছে, সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে করা হচ্ছে নানা অপকর্ম। আর এসবের শি’কার হচ্ছেন নারী-পুরুষ উ’ভয়েই। এসব অপকর্মে অনেক সময় নারীদেরই ফাঁ’দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার অনেকক্ষেত্রে পুরুষ নারীর সমন্বয়েই গড়ে ওঠে সং’ঘবদ্ধ চক্র।

সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বিভিন্নভাবে সংঘটিত হচ্ছে সাইবার অপরাধ। লাইভ ভিডিও, ছবির ট্র’ল বা বিকৃতকরণ, সাধারণ ভিডিওসহ নানা উপায়ে হেনস্তা করা হচ্ছে ব্যবহারকারীদের। আর ব্ল্যা’কমে’লের মতো গুরুতর অ’পরাধও সংঘ’টিত হচ্ছে অহরহ। প্রেম ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা যুগলদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি-ভিডিও নিজেদের মধ্যে শেয়ার করার ঘটনা নতুন নয়।

পরবর্তীতে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলে সেগুলোকেই পুঁজি করে শুরু হয় ব্ল্যা’কমে’ল। আবার মেয়ে হয়ে আরেক মেয়ের সঙ্গে ফেসবুকে বন্ধুত্ব তৈরি করে সেই মেয়েকেও ফেলা হচ্ছে ফাঁদে। পরিচিতি ও সম্পর্কের সূত্রে সরলতার সুযোগ নিয়ে অথবা ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাদের গোপন ভিডিও ধারণ করে জিম্মি করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও অনৈতিক সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে ভিডিও ধারণকারীরা।

প্রতিদিনই পুলিশের কাছে এসব বিষয়ে শতাধিক অভিযোগ জমা পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, নিজের ঘরে, রাস্তা-ঘাটে, নিজের অজান্তে গোপন ভিডিও ধারণের শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ জি’ম্মিদশায় পড়ছে। সামাজিক অব’ক্ষয়ে এই অপরাধটি ম’হামা’রী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। শিশু-কি’শোরদের নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে।

অ’পরা’ধ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রযুক্তির অ’প’ব্যবহার এবং অ’পরা’ধীর দৃষ্টা’ন্তমূলক শা’স্তি না হওয়ার কারণে সাইবার অপ’রাধ পাল্লা দিয়ে বে’ড়েই চলেছে। প্র’তা’রকদের ফাঁদে পড়া মানুষ তাদের অ’নৈতিক চাওয়া পাওয়া পূরণে রাজি না হলে তার কপালে যে কী ধরনের দুর্গতি নেমে আসে তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারও বোঝার উপায় নেই।

প্রথমে তার অডিও ভিডিও ক্লিপ পাঠানো হয় পরিবারে এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের কাছে। এতেও সুবিধা না মিললে ভুক্তভোগীর স্কুল, কলেজে, ভার্সিটি কিংবা কর্মস্থলে জনে জনে ছড়িয়ে দেওয়া হয় আপত্তিকর ভিডিওচিত্র। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত ভিডিওচিত্রই যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় তা নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্লুফিল্মের নগ্ন দৃশ্যাবলির সঙ্গে চেহারা জুড়ে সুপার ইম্পোজ করা ভিডিওচিত্রও ভাইরাল করা হয়।

এমন পরিস্থিতির শিকার নারী পুরুষের অবস্থা কী দাঁড়ায় তা সহজেই অনুমান করা সম্ভব। তার শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে, চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, সামাজিক যোগাযোগ এমনকি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। টানা ঘরবন্দী থাকাবস্থায় রীতিমতো মানসিক রোগীতে পরিণত হওয়ার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

সম্পর্কের সূত্র ধরে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার দৃশ্যাবলি গোপনে ভিডিও করে তা প্র’তারণামূলক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে গেল পাঁচ মাসেই দেশে চার শতাধিক মামলা দায়েরের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকাতেই এ ধরনের মা’ম’লা হয়েছে প্রায় দেড়শটি। তবে এর চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ভুক্তভোগী রয়েছেন যারা লোকলজ্জার ভয়ে থানা, পুলিশ, মামলা থেকে বিরত রয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার কেবল এক দিনেই সাতটি অভিন্ন ঘটনার উদাহরণ মিলেছে। বৃহস্পতিবার (২৭ মে) নেত্রকোনা ও কুষ্টিয়ায় দুই গৃহবধূ, গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার ও কালিয়াকৈরে দুই স্কুলছাত্রী, চট্টগ্রামে কিশোরী, রাজধানীর মিরপুরে এক তরুণী এবং পঞ্চগড়ে এক এনজিও কর্মীর গোপন ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে থানা-পুলিশ হয়েছে। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গোপন অডিও-ভিডিও ফাঁস করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছে সুযোগ সন্ধানীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের আওতাধীন সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধ দ্রুত তদন্তপূর্বক অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে তাদের সফলতায় অনেক ভুক্তভোগী কাক্সিক্ষত সুরাহাও পাচ্ছেন। কিন্তু ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন,

ঢাকার বাইরে সংঘটিত অনেক সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপে তেমন কোনো সুফল মেলে না। ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ডিভিশনের এসব অপরাধ তদন্তে সক্ষমতা থাকলেও ঢাকার বাইরে পুলিশের তেমন একটা দক্ষতা নেই বললেই চলে। ফলে ভুক্তভোগীর আইনি পদক্ষেপ তদন্তের নামে অদক্ষতার জের বইতে হয় মাসের পর মাস।

ভুক্তভোগীদের হতাশা আর চাপা দীর্ঘশ্বাস : গত চার বছরে সাই’বার অ’প’রাধ সং’ক্রা’ন্ত নিপীড়ন নির্যাতনের পাঁচ সহস্রাধিক অভিযোগের মধ্যে সরাসরি ১ হাজার ৬৩৫টি অভিযোগ মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। তাছাড়া সা’ইবার পু’লিশ সেন্টারের ফেসবুক পেজে আরও ৩৮ হাজার ৬১০ জন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন।

এর মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ জন ভুক্তভোগীই হচ্ছেন নারী। বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের সীমাহীন হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসই শোনা গেছে। রাজধানীর খিলগাঁও থানার গোড়ান এলাকার অধিবাসী স্থানীয় গার্লস হাইস্কুলের নবম শ্রেণির এক ছাত্রী আরও তিন বছর আগে সাইবার অপরাধের শিকার হয়।

তিনি এ ব্যাপারে যথারীতি মামলা করেছেন, আসামি গ্রেফতার হয়ে বেশ কিছুদিন হাজতবাসের পর জামিনে বেরিয়ে এসেছে। মামলায় অভিযুক্তের সাজা হওয়ার ব্যাপারেও আশাবাদী ওই ছাত্রী। কিন্তু ওই ছাত্রী চরম হতাশার সঙ্গে জানান,

আসামির শাস্তি হওয়া না হওয়ায় তার কোনো স্বস্তি নেই, কারণ, তার নিজের জীবনের সবকিছুই তো শেষ হয়ে গেছে। ওই ঘটনার পর তিন তিনটি স্কুল পাল্টিয়েও সে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। আত্মীয়স্বজনের নানা টিপ্পনির পাশাপাশি নিজ পরিবারের কাছেও সে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাভারের আরেক ছাত্রী নিজের সর্বস্ব হারিয়েও ফেসবুকের ব্ল্যাকমেলিং থেকে রেহাই পাননি। ফেসবুক বন্ধু নামের প্রতারক যেভাবে চেয়েছে সে ভাবেই ব্যবহৃত হয়েছে দশম শ্রেণির ছাত্রীটি। সবশেষে নিজের এবং ঘরে রাখা মায়ের স্বর্ণালঙ্কার চুরি করেও তুলে দিয়েছে প্র’তা’রকের হাতে। তারপরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আপ’ত্তিকর নানা ছবির প্র’চারণা দেখতে পেয়ে আ’ত্ম’হ-ত্যা’র পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে।

রাজধানীর উত্তরায় প-র্নো-গ্রা’ফি’র শি’কা’র এক তরুণী বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা করতেন প্রাইভেট ভার্সিটিতে। এক প্রভাষকের প্রেমে সাড়া দিয়েই তার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। প্রেমিকের সঙ্গে নানা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর পাতায় পাতায়।

এ ঘটনায় প্রেমিকও ছেড়ে গেছে তাকে, বন্ধ হয়ে গেছে পড়াশোনা। শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেওয়া ব্যাংকের চাকরিও হারিয়েছেন তিনি। অবশেষে পরিবারের সদস্যদের ধারাবাহিক বৈরী আচরণের মুখে ওই তরুণী তারই এক ফুফাতো বোনের বস্তি সাদৃশ্য বাসায় কোনোমতে মাথা’গুঁজে পড়ে আছেন। তিনি বলেন, সা’ইবা’র অ’পরা’ধের শি’কা’র নারীদের দুর্বিষহ জীবন অন্য কেউ বুঝবে না, সেখানে সব হারানো নারীদের গু’মরে কান্না ছাড়া আর কিছুই নেই।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*