সেভেন–আপ বনাম আগে কাপ পেয়ে দেখাও

অনেক দিন আকাশি–সাদা ও হলুদ–সবুজ জার্সির মধ্যে বাহাস হয় না। তার ওপর চলছে করোনার নিত্যনতুন ঢেউ। এক ঢেউ যেতে না যেতেই শুরু হয়ে যায় নতুন ঢেউয়ের উঁকিঝুঁকি। এসবের ফাঁকেই এবার মাথা তুলেছে কোপা। আর তাতেই বঙ্গদেশে শুরু হয়েছে দুই পক্ষের চিরবৈরিতার অনুশীলন। কেউ বলছে সেভেন–আপ খেতে। আর কেউ বলছে, আগে কাপ পেয়ে দেখাও…!

সেভেন–আপ একটি নিরীহ পানীয়। কিন্তু এটিই এখন হয়ে গেছে ব্রাজিলপ্রেমীদের বাগে পাওয়ার চাবিকাঠি। জার্মানির কাছে নাকানিচুবানি খাওয়ার সেই রাত (বাংলাদেশ সময়) কি আর কোনো নেইমারে মুগ্ধ দর্শক ভুলতে পারে? আর ক্ষতটাও এতটাই চিরায়ত যে, খোঁচা দিলে ব্যথা লাগবেই। ব্যথার চেয়েও জ্বলে বেশি। সেই জ্বলুনি হিমশৈলের শীতল পরশেও কমে না।

তবে হ্যাঁ, কমানোর একটা পথ আছে। সেটাই মোক্ষম পথ। ওতে প্রতিপক্ষের বুকও মোচড় দিয়ে ওঠে। সাপও মরে, লাঠিও ভাঙে না অবস্থা আর কী। মোক্ষম প্রতিকারের মূল বাক্য হলো—‘আগে কাপ পেয়ে দেখাও…’। এই অস্ত্রের প্রধান কাজ হলো, নীল–সাদার সমর্থকদের কাপ না পাওয়ার যে মনোবেদনা, তা খুঁচিয়ে দগদগে বানানো।

তবে এই কাপ চায়ের কাপ নয়। সে তো মেসিদের অনেক আছে নিশ্চয়ই। এটা টুর্নামেন্টের কাপ। এতে বিশ্বকাপ একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বটে। এদেশীয় সমর্থকদের ওই টুর্নামেন্টেই সবচেয়ে বেশি বছর ধরে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে কিনা। আর আর্জেন্টিনার কোপার সর্বশেষ কাপ পাওয়ারও তো অনেক দিন হয়ে গেল। আর তা দিয়েই তাতিয়ে দেওয়া হয় মেসিপ্রেমীদের।

খোঁচানোর বর্শা আরও আছে। এই যেমন—‘মেসি একা আর কী করবে?’, ‘মেসিকে তো খেলতেই দিচ্ছে না…’, ‘সবাই মিলে মেসিকে আটকালে, খেলায় ছন্দ থাকবে কী করে?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ছাড়া পায়ের বদলে হাত দিয়ে গোল করার বিষয়টিও টেনে আনেন অনেকে। সব মিলিয়ে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার।

জন্মসূত্রে বাংলাদেশি, মনসূত্রে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরাও বসে থাকেন না। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন নেইমারের ‘মাটির টান’ নিয়ে! মাটির টান বলতে আসলে বোঝায় হুটহাট সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে পড়াকে। অনেকে নেইমারের ‘অভিনয়ক্ষমতা’ নিয়েও কড়চা শুরু করেন।

কারও কারও মতে, এই মাটির টানের সঙ্গে অভিনয়ক্ষমতার আছে ঘনিষ্ঠ মিতালি। কেউ কেউ আবার নেইমারকে অস্কারের মঞ্চে দেখার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করে থাকেন। আর্জেন্টিনা–ব্রাজিলের সমর্থকদের এই খণ্ডযুদ্ধ এ দেশের হাওয়া–জলে কেন এত তীব্র হয়ে ওঠে, তার সদুত্তর অবশ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।

সেই আন্ডা–বাচ্চাকাল থেকে দেখে আসছি এ লড়াই। খোদ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার স্বদেশি সমর্থকদের মধ্যে এমন বৈরী মনোভাব আদৌ আছে কি না, সেটি নিয়েও সন্দেহ জাগে মনে। অবশেষে সেই নেইমার ও মেসির হয়ে লড়াই করতে করতেই সন্দেহের যবনিকা টানা হয়।

মনে মনে ভাবি, এর একটা এসপার–ওসপার হওয়া জরুরি। খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের বদলে মুখোমুখি লড়াই ভালো নয় কি? একেবারে দুধ কা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যাওয়া আর কী! অন্তর্জালের দুনিয়ায় ঢুঁ মেরে যা পেলাম, তাতেও শান্তি নেই। এখন পর্যন্ত যতবার মুখোমুখি রণে নেমেছে ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা, সেখানেও খানিকটা ড্র পরিস্থিতি।

ইলেভেন ভার্সেস ইলেভেন নামের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুসারে, সংখ্যার হিসাবে জয়ের দিক থেকে হয়তো সাম্বা নাচ এগিয়ে আছে (৪৬ ম্যাচে জয়), তবে মেসিদের চোখের জলও (নিন্দুকদের ভাষায় ট্রেডমার্ক) পিছিয়ে নেই (৪০ ম্যাচে জয়)।এবার কি একটা তেমন ম্যাচ হতে পারে? হলে খারাপ হতো না।

সেভেন-আপ বনাম আগে কাপ পেয়ে দেখাও–এর একটা সাময়িক সুরাহাও হতে পারত তবে। কিন্তু এই বিবাদের চিরস্থায়ী সমাধান অবশ্য আমিও প্রত্যাশা করি না। আজীবন যা দেখে আসছি, তা হুট করে নাই হয়ে গেলে আমারও তো খালি খালি লাগবে। আশা করি, এ ধরনের মনোভাব আরও অনেকের মনের গহিনেই লুকিয়ে আছে।

সেই সাময়িক সুরাহার আশাতেই বরং দিন গোনা যাক। দেখি না, ম্যাচ শেষে কে চোখ নাচিয়ে সেভেন–আপ খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে পারে। আর কে বলতে পারে—আগে কাপ পেয়ে দেখাও…!

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*