যে কারণে ব্রাজিলের জার্সি সাদা-নীল থেকে হলুদে রূপ নিল

বর্তমান প্রজন্ম ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনা দেখালেও ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাকি সব ফিকে হয়ে যায়। ফুটবলের আমেজে ভরপুর হয়ে ওঠে গোটা বিশ্ব।তবে ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা বাংলাদেশে হয়তো একটু বেশিই হয়। বিশেষকরে ফুটবলের লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে।

আর যদি দ্বৈরথ থাকে এ দুই দেশের মধ্যে তবে তো উত্তেজনার পারদ চরমে ওঠে।এবারের কোপা আমেরিকা নিয়েও একই রকম উত্তেজনা বিরাজ করছে বাংলাদেশে। যদিও করোনায় লকডাউনের কারণে হয়তো বিষয়টি সেভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না । তবে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে সয়লাভ কোপা আমেরিকা নিয়ে পোস্ট, ভবিষ্যদ্বাণী, নেইমার-মেসিদের নিয়ে আলাপ আলোচনা।

আকাশি-নীল ও হলুদ জার্সি পরে ছবি তুলে পোস্ট করেছেন অনেকে। হলুদ আর নীল-আকাশিতে ছেয়ে গেছে ফেসবুক।বাংলাদেশে ব্রাজিল দলের সমর্থক অগণিত, তা হলুদ জার্সির বিক্রি দেখেই বোঝা যায়।

আসলে ফুটবলের গৌরবের সঙ্গে রঙটি মিশে আছে। সর্বকালের সেরাদের সেরা ফুটবলাররা হলুদ জার্সি গায়ে দিয়ে মাঠ মাতিয়েছেন, মাঠ মাতাচ্ছেন। পেলে, জর্জিনহো, গারিঞ্চা, জিকো, সক্রেটিস আর রোনালদোর মতো ফুটবলাররা এ রংটাকে নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়।

কিন্তু কারো মাথায় এ প্রশ্ন এসেছি কি – ব্রাজিল ফুটবল দলের জার্সির রঙ হলুদ কেন? কারণ আগে তো সাদার মধ্যে নীল রংয়ের জার্সি পরেই মাঠে নামত ব্রাজিল। তা পাল্টে হলুদে ডুবল কেন সেলেকাওরা?

ইতিহাস বলছে – ১৯৫৪ সালের আগে ব্রাজিল ফুটবল দলের জার্সি ছিল সাদার মধ্যে নীল রংয়ের ছোঁয়া। আর তা পাল্টে হলুদে ডুবে যাওয়ার পেছনের কারণ ‘মারাকানা ট্র্যাজেডি’। যেই মারাকানায় রোববার সকালে কোপা আমেরিকার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কেউ না পারলেও ফুটবল পাগল জাতি ব্রাজিল বিশ্বকাপের আয়োজন করে। ১৯৫০ সালের সেই বিশ্বকাপ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় রিও ডি জেনেইরোর এই মারাকানা স্টেডিয়ামে। সেই ফাইনালে শেষবারের মতো সাদা-নীল জার্সি পরে খেলেছিল ব্রাজিল।

বিশ্বকাপের ওই আসরে এক ম্যাচের ফাইনাল খেলা হয়নি। চার দলের চূড়ান্ত পর্বে প্রথম দুই ম্যাচে জিতেছিল ব্রাজিল, আর একটি করে জয় ও ড্র নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল উরুগুয়ে। তাই মারাকানায় শেষ দিন যখন তারা মুখোমুখি হয়েছিল, তখন সেটা মর্যাদা পেয়েছিল ‘অলিখিত’ ফাইনালের।

আশায় বুক বেধে লাখ লাখ ব্রাজিলিয়ান অপেক্ষা করছিল বিশ্বকাপ ঘরে তুলবে তারা। কিন্তু ওই ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ২-১ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে ৩ ম্যাচে ৫ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় প্রথম বিশ্বকাপের বিজয়ী উরুগুয়ে। ১১ মিনিট বাকি থাকতে ঘিগিয়ার লক্ষ্যভেদী শটে মারাকানায় উপস্থিত হাজার হাজার ব্রাজিলিয়ানের হৃদয়ে শুরু হয় রক্তক্ষরণ।

সেই হৃদয় ভাঙার ম্যাচকে ইতিহাসে ‘মারাকানা ট্র্যাজেডি’ বলে লিখে দিয়েছে ফুটবলবিশ্ব।এমন পরাজয়ের পর সাদা-নীলের জার্সি আর গায়ে চড়াতে চাইছিল না ব্রাজিলিয়ান ফুটবলাররা। সাদা-নীল থেকে সরে আসার পথ খুঁজছিলেন দেশটির ফুটবল কর্তারা। সুযোগটি কাজে লাগায় দেশটির সে সময়ের সনামধন্য পত্রিকা ‘কোরেয়ো ডা মানহা’।

১৯৫৩ সালের পত্রিকাটি ব্রাজিলের নতুন জার্সির ডিজাইন নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। ঘোষণা দেওয়া হয়, সেরা ডিজাইনের জার্সিটি পরেই পরের বিশ্বকাপে খেলতে নামবে ব্রাজিল দল।তবে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে যেমন খুশি ডিজাইন করুক কিন্ত ব্রাজিলের পতাকার চার রং-হলুদ, নীল, সবুজ আর সাদার সমাহার থাকতে হবে জার্সিতে।

ব্যস, ভুরিভুরি ডিজাইন জমা পড়ে। সে সংখ্যাটা ৪০১টি বলে বলা হয়েছে। এদের মধ্যে উরুগুয়ে সীমান্তের কাছাকাছি থেকে ১৮ বছর বয়সী এক শিল্পীর ডিজাইন মনে ধরে ব্রাজিলের ফুটবল কর্তাদের। ওই শিল্পীর নাম অ্যালডর গার্সিয়া শ্যালে।

বলা হয়েছে – ১০০ ধরনের নকশা ও রং নিয়ে পরীক্ষা করে এই হলুদ রংয়ের জার্সি তৈরি করেছিল গার্সিয়া। জার্সির পায়ে নীল রংয়ের মোজা। ওই হলুদ জার্সিটি পছন্দ হয়।

১৯৫৪ সালের ১৪ মার্চে রিও ডি জেনিরোর সেই মারাকানায় ১ লাখ ১২ হাজার ৮০৯ জন দর্শকের সামনে প্রথমবারের মতো এ জার্সি গায়ে চড়িয়ে মাঠে নামে ব্রাজিল। তার চার বছর পরেই সুইডেনকে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল।

গার্সিয়ার ডিজাইন করা জার্সি আজ জগদ্বিখ্যাত। যা সময়ের পরিক্রমায় ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নাইকি হাতে এসে পড়েছে। ব্রাজিলের অফিসিয়াল জার্সিটা তারাই তৈরি করে এখন। নাইকি জানিয়েছে, এই হলুদ জার্সি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত জাতীয় দলের জার্সি ।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*