যেসব কারণে অলিম্পিকের ময়দানে থাকে না ক্রিকেটের আলপনা

ফুটবল বিশ্বকাপ যদি হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’, তাহলে অলিম্পিক হচ্ছে ‘মাদার অব অল স্পোর্টিং ইভেন্ট’। পৃথিবীর হেন কোনো জনপ্রিয় খেলা নেই যা অলিম্পিকে মঞ্চায়িত হয় না। সম্মানজনক এই প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য তাই বিশ্বের সব রাষ্ট্রই মরিয়া হয়ে থাকে।

ফুটবল, টেনিস থেকে শুরু করে ঘোড়দৌঁড় কি না আয়োজিত হয় এই এক টুর্নামেন্টে। থাকে ইনডোর স্পোর্টসের সকল ব্যবস্থাও। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, এতো কিছুর পর ক্রিকেট কেন অলিম্পিকে আয়োজিত হয় না? আসলে প্রথমবারের মতো অলিম্পিকে ক্রিকেটকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৮৮৬ সালে।

কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রতিযোগী না থাকায়, সেবারে ইভেন্টটি আয়োজিত হয়নি। এরপর ১৯০০ সালে প্যারিসে আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে প্রথম এবং এযাবতকালের শেষ অলিম্পিক আয়োজিত হয়েছিলো। সেবার ক্রিকেটের ইভেন্টের জন্য দুইদিনের একটি টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করার নির্দেশ দিয়েছিল অলিম্পিক কর্তৃপক্ষ।

প্রতিযোগী বলতে এবারেও ছিল স্রেফ গ্রেট ব্রিটেন আর স্বাগতিক ফ্রান্স। এর মধ্যে ফ্রান্সের দলটি আবার গঠিত হয় একঝাঁক ব্রিটিশ অভিবাসীকে নিয়ে। অন্যদিকে ব্রিটেনের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন ডেভন এন্ড সমারসেট ওয়ান্ডাররার্স ক্রিকেট ক্লাবের সদস্যরা।

এই দুই দল মিলিয়ে মাত্র হাতে গোণা কয়েকজনই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা রাখতেন। সুতরাং ইভেন্টটি মোটেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিলো না। যা হোক, ১৫৮ রানে ফরাসিদের উড়িয়ে শেষ হাসিটা ব্রিটেনই হেসেছিলো। ফলে ব্রিটেনকে স্বর্ণপদক আর ফ্রান্সকে রৌপ্য পদকটি দেওয়া হয়েছিলো।

এরপর ১৯০৪ সালের আসরেও ক্রিকেট থাকার কথা থাকলেও, শেষ পর্যন্ত তা আর আয়োজন করা হয়ে ওঠেনি। অলিম্পিকে ক্রিকেটের এই করুণ দশার পেছনে অবশ্য কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত ক্রিকেট একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নির্ভর খেলা।

একটি ক্রিকেট ইভেন্ট আয়োজন করতে আয়োজক দেশকে নিয়ম মেনে মাঠ তৈরি করাসহ প্রয়োজনীয় কিছু দামি প্রযুক্তি, যেমন – বিশেষ ধরনের মাইক্রোফোনের জোগাড় করতে হবে। ইভেন্ট শেষে যেগুলো আয়োজকদের জন্য একটি ‘লস প্রজেক্ট’ ছাড়া কিছু নয়।

এছাড়াও ক্রিকেট ম্যাচের লম্বা সময় খরচের প্রবণতা এবং ইভেন্টে অংশগ্রহণকারী দেশের সংকট ইভেন্টটির প্রতি আয়োজকদের অনাগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার অনেক ক্রীড়া বিশ্লেষক ক্রিকেটকে এখনো মূল ধারার খেলাধুলা হিসেবে মানকে নারাজ।

উপরন্তু গত শতকে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রভাবে খেলাটি বিশ্বের অনেক প্রান্তে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে আশার কথা হচ্ছে, আইসিসি ২০২৮ অলিম্পিকে ক্রিকেটকে অন্তর্ভুক্ত করার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আবির্ভাবের পর অনেকেই ক্রিকেটের প্রতি নিজেদের মনোভাবের পরিবর্তন এনেছেন।

আবার মধ্যপ্রাচ্যের টি-টেন লিগের আগমন ক্রিকেটকে অলিম্পিকে যোগ করার দাবিকে আরো বেগবান করেছে। তাছাড়া বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলোতেও নিয়মিত ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজিত হচ্ছে এবং ক্রিকেটের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ার দরুণ নতুন নতুন মাঠ তৈরি হচ্ছে।

ফলে ক্রিকেটকে অলিম্পিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে যেসকল বাঁধা ছিলো, তাও অনেকটাই দূরীভূত হয়েছে। সবমিলিয়ে ক্রিকেটকে তাই হয়তো দ্রুতই দেখা যাবে অলিম্পিকের মঞ্চে – এমনটাই আশা সবার।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*