যেখানে হীরার বৃষ্টি হয় !

এক জিনিয়াস জ্যোর্তিবিদ উরবেইন লি ভ্যারিয়ের তার জীবনের বড় অংশে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটিয়েছে। তিনি দূরবীন দিয়ে সব সময় নতুন নতুন গ্রহ ও তারকা খুঁজতেন। যখনকার সময়ের কথা বলছি তখন মানুষ ভাবত, আমাদের সৌরজগত বা সূর্যের সাম্রাজ্য ইউরোনাস গ্রহ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। কিন্তু কৌতুহলী মানুষের মনে নানা অসাধারণ প্রশ্নের জন্ম নেয়।

একদিন উরবেইন লি ভ্যারিয়ের খেয়াল করলেন যে ইউরোনাস গ্রহ সর্বশেষ গ্রহ হলেও এই গ্রহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিউটনের গতি সূত্রকে মানে না। কিন্তু এটা তো হতে পারে না যে কোনো গ্রহ কিংবা কোনো বস্তু নিউটনের গতি সূত্রকে অগ্রাহ্য করে চলবে! পৃথিবী থেকে ৪৫০ কোটি কিলোমিটার দূরের এই গ্রহ একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে গিয়ে নিউটনের গতির সূত্রকে অগ্রাহ্য করে।

কেবল উরবেইনই না, ওই সময়ে ইউরোনাস আবিষ্কৃত হওয়ার ৬০ বছর পর্যন্ত সকল জ্যোর্তিবিদই এর কারণ বুঝতে পারছিলেন না। তারা মনে করতো হয় নিউটনের সূত্র ভুল। আর না হয় ইউরেনাস গ্রহে কোনো ভূতের প্রভাব আছে। এটা কোনো অজানা রহস্য। কিন্তু এই অজানা রহস্যটা কী? ১৮৪০ সালে এই রহস্যের পর্দা ভেদ হয়ে গেল। কিন্তু কিভাবে? চলুন নেপচুনের যতকথায় এ সম্পর্কে জানা যাক।

১৮৪০ সালে প্রফেসর উরবেইন লি ভ্যারিয়ের তার টেবিলে থাকা কাগজ ও দেয়ালে থাকা ব্ল্যাক বোর্ডকে নানা গাণিতিক সমীকরণ দ্বারা ভরে ফেললেন। তিনি ওই সময়ের সকল জ্যোর্তিবিদের মতো ইউরোনাসের এই অদ্ভুত ঘূর্ণনের কারণ বুঝতে চাচ্ছিলেন।

উরবেইন হিসাব করলেন যে ইউরোনাসের এই অদ্ভুত ঘূর্ণন তখনই সম্ভব যখন এর পাশে একটি বড় গ্রহ কিংবা অন্য কিছু থাকবে। কিন্তু কোনো বড় গ্রহ বা অন্য কিছু থাকলে তা তো দেখা যাওয়ার কথা। না কি ইউরোনাসের পাশে কোনো ছোট গ্রহ বা অন্য কোনো কিছু আছে।

লি ভ্যারিয়ের মতে, কোনো ছোট গ্রহ বা অন্য কিছু ইউরোনাসের ঘূর্ণণকে এতটা পরিবর্তন করতে পারে না। ১৮৪৬ সালে উরবেইন লি ভ্যারিয়ের বার্লিন অবজারবেটরিকে একটি চিঠি লিখলেন। ওই চিঠিতে উরবেইন লি ভ্যারিয়ের অনুরোধ করলেন একটি নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট কোণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপ দিয়ে যেন আকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়। লি ভ্যারিয়ের এই চিঠি ১৮৪৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ড. জোহান গটফ্রিড গেইলের কাছে পৌঁছায়।

ড. গেইল তার সিনিয়রদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ওই রাতেই লি ভ্যারিয়েরের বলা ডিগ্রিতে টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। প্রথমে তো ড. গেইল কিছু দেখতে পেলেন না। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর ড. গেইল ইউরোনাসের পাশে একটি বড় নীল অজানা জিনিসকে বা কোনো নীল ভূতকে আকাশে সাঁতার কাটতে দেখেন। এই অজানা নীল বৃত্ত অনেক বড় ছিল। এতটা বড় যে এর ভিতর অনেকগুলো পৃথিবী ঢুকে যেতে পারত।

আর এই অজানা বৃত্ত উরবেইন লি ভ্যারিয়ের হিসের করা কোণ থেকে মাত্র ১ ডিগ্রি ভিন্ন ছিল। কিন্তু এই নীল গ্রহকে উরবেইন লি ভ্যারিয়েররের আগে গ্যালিলিও গ্যালিলেই আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু গ্যালিলিও গ্যালিলেই এই গ্রহকে তারা ভেবেছিলেন। এই গ্রহকে গ্যালিলিও গ্যালিলেই তারা হিসেবেই চিহ্নিত ও অংকন করতেন।

এই জন্য এই গ্রহ আবিষ্কারের সম্মান গ্যালিলিও গ্যালিলেইয়ের পরিবর্তে উরবেইন লি ভ্যারিয়ের অর্জন করেন। গ্রহ আবিষ্কার হওয়ার পর এবার নাম রাখার পালা ছিল। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে গ্রহ, নক্ষত্র, জ্যোতিষ্ক, ছায়া পথ ও উপগ্রহের নামকরণ নিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে দারুণ প্রতিযোগিতা হয়। তো এই নীল গ্রহের নামকরণের প্রতিযোগিতার পর উরবেইন লি ভ্যারিয়ের বললেন, আমি এই গ্রহের নাম লি ভ্যারিয়ের রাখব।

তার দেশ ফ্রান্সের বিজ্ঞানীরাও এই দাবি সমর্থন করছিলেন। কিন্তু ফ্রান্সের বাইরে অন্য কোনো বিজ্ঞানী এই নাম সমর্থন করেননি। যেহেতু সকল গ্রহ, নক্ষত্র ও উপগ্রহের নাম রোমান কিংবা গ্রিক দেব দেবীর নামে রাখা হয়। তাদের দাবি ছিল, এই গ্রহের নামও কোনো রোমান অথবা গ্রিক দেবীর নামে রাখা হোক। এই ঘটনার ঠিক ৬৫ বছর আগে জ্যোর্তিবিদ উইলিয়াম হার্শেল ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কার করেন।

কিন্তু তার নামনাসুরে গ্রহের নামটি না রেখে এ গ্রহের নীল রঙের কারণে ওই গ্রহের নাম গ্রিক দেবতা ইউরেনাসের নামে রাখা হয়। উরবেইন লি ভ্যারিয়ের ইউরেনাসের নাম পরিবর্তন করে হার্শেল ও আবিষ্কৃত নীল গ্রহের নাম লি ভ্যারিয়ের করে দিতে বলেন। কিন্তু বিজ্ঞানীমহলে এর বিরোধিতা হয়। তাই লি ভ্যারিয়েরের আগে থেকে ভেবে রাখা নাম নেপচুন বলে দেন।

নেপচুন ছিল রোমান দেবতার নাম। রোমান পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী যে সমুদ্রের ঢেউ এবং ঝড়ের ওপর রাজত্ব করত। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় সকল জায়গায় নেপচুনকে নেপচুনই বলা হয়। লি ভ্যারিয়ের তার নামে গ্রহের নাম না রাখতে পারলেও লি ভ্যারিয়ের এমন একটি সম্মান পেল।

যার ফলে এই গ্রহের সাথে তার নাম জুড়ে রয়েছে। ওই সম্মান কী ছিলো? গ্যাসের চাদরে ঢাকা ঠান্ডা এই গ্রহ নেপচুনের চারদিকে শনি ও ইউরেনাস গ্রহের মতো পাথরের গোল বলয় বা রিং আছে। কিন্তু যেই গ্রহটাকে প্রায় দেখাই যায় না তার রিং আছে এটা কিভাবে জানা গেল?

মহাকাশযান ভয়েজার-২ ৫৯১ সেকেন্ডের দুটি এক্সপোজারের মাধ্যমে নেপচুনের রিংয়ের ছবি তুলে। দুটি অংশে বিভক্ত ওই ছবিতে নেপচুনের ৫টি রিং দেখা যায়। ওই ছবিটি নেপচুন থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে তোলা হয়েছিল। নেপচুনের রিংগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিংকে লি ভ্যারিয়ের রিং বলা হয়। এটা হলো ওই সম্মান যা লি ভ্যারিয়ের পেয়েছে। আপনি যদি কখনো ফ্রান্সে যান।

তাহলে মোন্টপারনেসি সিমেট্রি কবরস্থান ঘুরে আসতে পারেন। এই কবরস্থান বেশ অন্য রকম। এই কবরস্থানে ফ্রান্সের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সমাধি রয়েছে। এই কবরস্থানে কোন ভাস্করের সমাধিতে একটি ঘোড়ার ভাস্কর্য আছে। এই কবরস্থানেই চার্লস পিগিওনের কবরের ওপর চার্লস ও তার স্ত্রীর ভাস্কর্য আছে। যেখানে চার্লস হাতে পেনসিল ও ডাইরি নিয়ে তার বেডরুমে স্ত্রীর পাশে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কোনো কোনো কবরের ওপর একটি এমন পাখি আছে, যা কখনো দেখতে অক্টোপাসের মতো। আবার কখনো দেখতে গাছের মতন। কোনো কবরের ওপর রয়েছে এক পাথরের সুন্দরী, না জানি সে কত দিন যাবৎ কাঁদছে। আর এই কবরস্থানেই একটি উঁচু কবরও আছে। যার ওপর নেপচুন গ্রহের ভাষ্কর্য আছে।

এই কবরেই শুয়ে আছেন উরবেইন লি ভ্যারিয়ের, যিনি তার অসামান্য গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে নেপচুন গ্রহকে আবিষ্কার করেছিলেন। যিনি তার জীবনের বেশির ভাগ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটিয়েছেন। উরবেইন লি ভ্যারিয়েরের নেপচুন গ্রহ আবিষ্কার ওই শতকের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল।

যা আমাদের সৌরজগতের সীমানা বাড়িয়ে দেয়। যা আমাদের সৌরজগতের মানচিত্র পরিবর্তন করে দেয়। এই গ্রহ নেপচুন অস্পষ্ট বা আকাশে হালকা রংয়ের হওয়ার কারণে দেখা যায় নি। নেপচুন সাধারণ অস্পষ্ট যেকোন তারকার চাইতে ৫গুণ বেশী অস্পষ্ট।

এছাড়া নেপচুনের পৃথিবী থেকে দূরত্বও এর কারণ। নেপচুন থেকে পৃথিবীর দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি। যদি পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার দূরত্বকে ১ এস্ট্রোনোমিকাল ইউনিট ধরা হয়। তাহলে পৃথিবী থেকে নেপচুনের দূরত্ব হবে ৩০ এস্ট্রোনোমিকাল ইউনিট। তাও বলি, পৃথিবী ও নেপচুন যখন খুব কাছে আসে তখন নেপচুন ও পৃথিবীর দূরত্ব ৪৩০ কোটি কিলোমিটার বা ৪.৩ বিলিয়ন কিলোমিটার হয়।

সূর্য থেকে খুব দূরে অবস্থিত হওয়ার কারণে নেপচুনের এক বছর পৃথিবীর ১৬৫ বছরের সমান। নেপচুনের হিসাবে নেপচুন আবিষ্কার হয়েছে মাত্র এক বছর হলো। কারণ ১৮৪৬ সালে নেপচুন আবিষ্কার হওয়ার সময় নেপচুনকে যে জায়গায় দেখা গিয়েছিল। ১৮৪৬ সালের ওই জায়গা থেকে নেপচুন সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে ২০১১ সালে ওই জায়গায় ফিরে এসেছে। সে হিসাবে নেপচুন আবিষ্কার হয়েছে যে, মাত্র এক বছর হয়েছে।

নেপচুন আবিষ্কার হওয়ার ফলে সেই রহস্যেরও সমাধান হয়ে গেল যার কারণে ইউরেনাস গ্রহের ঘূর্ণন বিশেষ জায়গায় পরিবর্তিত হয়। ইউরেনাস গ্রহের ঘূর্ণন একটি বিশেষ জায়গায় বিশেষ সময়ে পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনটা তখন ঘটে যখন নেপচুন ইউরেনাসের কাছে আসে। নেপচুন গ্রহ এতটাই জটিল যে এর ব্যাপারে আরো কিছু জানার জন্য আপনাকে একটি কিংবদন্তী মহাকাশযান বা স্পেসশিপের কাহিনী জানতে হবে।

১৯৭৭ সালে কিংবদন্তী মহাকাশযান ভয়েজার-২ যখন মহাকাশে প্রেরণ করা হয়, তখন তার ১২ বছর পর নেপচুনের কাছে পৌঁছে যায়। ভয়েজার-২ তার যাত্রা পথে গ্রহ ও মহাকাশের অন্যান্য জিনিসের অসাধারণ ছবি তুলে ছিল। কিন্তু নেপচুনের কাছে এসেই ভয়েজার-২ খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে যায়। ভয়েজার-২ পৃথিবীর চেয়ে ৪ গুণ প্রশস্ত গ্রহ নেপচুনকে দেখতেই পায়নি। কিন্তু ভয়েজার-২ অত্যন্ত দক্ষ এক মহাকাশযান ছিল।

ভয়েজার-২-কে যেকোনোভাবেই নেপচুনের ছবি নিতে হতো। আর পৃথিবীতে থাকা ভয়েজার-২-এর নিয়ন্ত্রক টিমও অত্যন্ত দক্ষ টিম ছিল। কিন্তু ভয়েজার-২ যে ক্যামেরা দিয়ে নেপচুনের ছবি তুলতে, তা গুলির গতির চাইতেও বেশি গতিতে চলছিলে। গুলির গতি সেকেন্ডে ০.৫ বা ১ কিলোমিটার হয়ে থাকে। অন্যদিকে ভয়েজার-২-এর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১৯ কিলোমিটার ছিল।

নেপচুনে সূর্যের আলো পতিত হওয়ার পরিমাণ ছিল পৃথিবীতে পতিত হওয়া সূর্যের আলোর ০.০০১ শতাংশ। তো ভয়েজার-২ তাহলে কিভাবে নেপচুনের ছবি তুলল? ভয়েজার-২-এর টিম ভয়েজার-২-কে নতুন অ্যাঙ্গেলে সেট করে দেয়। এই অ্যাঙ্গেল থেকে ভয়েজার-২ ৪ ঘন্টা যাবৎ নেপচুনের ছবি তুলতে থাকে।

তারপর জার্মানি, স্পেন, মেক্সিকো ও আমেরিকার রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা এন্টেনাগুলোকে ২৩০ ফুট বিস্তৃত করে রাখা হয় কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত। ভয়েজার-২ নেপচুনের ৫ কোটি ৭০ লাখ কিলোমিটার দূর থেকে তোলা হালকা নীল রংয়ের ছবিটি পৃথিবীতে পাঠায়। এই ছবিই নেপচুনের একমাত্র ছবি যা কোনো মহাকাশযান থেকে তোলা হয়েছিল।

নেপচুনের ছবিতে দেখা যায় একটি সাদা ডিম্বাকৃতি দেখা যায়। যা ছিল নেপচুনের পৃষ্ঠে একটি ঝড়। আর এই ঝড়ের ভিতর অনায়াসে আমাদের পৃথিবী ঢুকে যেতে পারত। কিন্তু এই ঝড় তো ১৯৮৯ সালে ছিল। বর্তমান সময় পর্যন্ত এরকম বহু ঝড় নেপচুন তৈরি হয়ে শেষেও হয়ে গেছে। কারণ নেপচুনে প্রায় সব সময়ই ঝড় চলতে থাকে।

নেপচুন গ্রহ আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে ঝড়ো আবহাওয়া পূর্ণ গ্রহ। নেপচুনের বায়ু হিমায়িত মিথেন, হাইড্রোজন ও হিলিয়াম নিয়ে নেপচুনের পৃষ্ঠে ২০০০ কিলোমিটার গতিবেগে প্রবাহিত হয়। নেপচুনের বায়ুর এই গতিবেগ সবচেয়ে বড় গ্রহ বৃহস্পতির বায়ু প্রবাহের গতিবেগের চেয়েও ৩ গুণ বেশি। পৃথিবীর ঝড়ের সাথে নেপচুনের ঝড়ের কোনো তুলনা হয় না বললেই চলে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশ গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ঘন্টায় ৪০০ কিলোমিটার। আর নেপচুনে তা ২০০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবীর ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগের চেয়ে ৫ গুণ বেশি গতি। নেপচুনের সেই ঘূর্ণিঝড়ের ওপর আরো একটি ঘূর্ণিঝড় সেই ঘূর্ণিঝড়ের ওপর আরো একটি ঘূর্ণিঝড়। কেমন হবে সেই ঘূর্ণিঝড়? এরকম একটি ঘূর্ণিঝড়ের ছবি তুলেছিল ভয়েজার-২।

আপনি যদি নেপচুনে ঘূর্ণিঝড়ের ওপর ঘূর্ণিঝড়, সেই ঘূর্ণিঝড়ের ওপর আরও একটি ঘূর্ণিঝড়ের কথা জেনে যদি অবাক হন তাহলে আপনার জন্য আরো কিছু আছে যা জানলে আপনি আরো অবাক হবেন। নেপচুন ওই গ্রহ যাতে হীরার বৃষ্টি হয়। এটা সত্যি। নেপচুনে হীরার বৃষ্টি হয়। নেপচুনে কার্বন ও হাইড্রোজেন যৌগের অণু মুক্ত অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। তারপর অতিরিক্ত চাপে এরা কেলাসিত হয়ে হীরার টুকরোতে পরিণত হয়।

তারপর বৃষ্টির মতো নেপচুনের গাঢ় ও গভীর বায়ুমণ্ডল থেকে নেপচুনের কেন্দ্রে পতিত হয়। এই হীরার বৃষ্টির কতটা শুনে যতটাই লোভ হোক না আপনার আরো কিছু জানার বাকি আছে। আপনি ছোট বেলায় তো আলিফ লায়লার গল্পে দেখেছেন যে হীরার বাক্সের কাছে বা হীরা বা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদের পাশে একটি সাপ থাকে। যা সেই সম্পদকে রক্ষা করে।

কিন্তু নেপচুনে এরকম কোনো সাপ নেই। পৃথিবীর সাপগুলোকে বীন বাজিয়ে বশ করাও যায়। নেপচুনে সাপ না থাকা সত্ত্বেও নেপচুনের হীরা আপনি পৃথিবীতে আনতে পারবে না। কারণ নেপচুনে সব সময় ঘূর্ণিঝড়ের ওপর ঘূর্ণিঝড় চলতে থাকে। আর নেপচুনের শীতল আবহাওয়ায় আমরা বাঁচতে পারব না।

যদি কেউ সেখানে চলেও যায় তাও হীরা আনতে পারবে না। কারণ ধারাল হীরার বৃষ্টি সেখানেই তার শরীরকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। নেপচুন আল্লাহর এক অবসাধারণ সৃষ্টি। যেখানে প্রতি মূহূর্তে হীরার বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু না সেখানে কোনো জীব আছে আর না কোনো মানুষ সেখানে পৌঁছাতে পারবে।

আল্লাহর এই নিদর্শন যেন আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে আল্লাহর কাছে এই সম্পদ ও সৃষ্টিজগতের কোনো মূল্য নেই। এতো মানুষকে পরীক্ষার উপকরণ মাত্র। মানুষ আল্লাহর বিধানকে আঁকড়ে ধরলে আল্লাহ আমাদের জন্য আকাশ থেকে ধন সম্পদসহ সকল প্রয়োজনীয় জিনিসের বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। নেপচুন সেই গ্রহ যেখানে আছে প্রচুর সম্পদ। কিন্তু না সেখানে কোনো মানুষ যেতে পারবে। আর না কোনো জীব সেখানে জন্মাবে।

চলুন নেপচুন ছেড়ে সমানে যাওয়া যাক। মহাকাশযান ভয়েজার-২ ও নেপচুনকে ছেড়ে অনেক সামনে এগিয়ে গেছে। ভয়েজার-২ নেপচুনকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ৫ ঘণ্টা পর ভয়েজার-২ নেপচুনের সবচেয়ে বড় চাঁদ ট্রাইটনের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। ভয়েজার-২ ট্রাইটনের থেকে মাত্র ৪০ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে কয়েক টুকরোয় ট্রাইটনের ছবি তুলেছিলো।

যা পৃথিবীতে একটি ছবি হিসেবে রিসিভ করা হয়। নেপচুনের এই সুন্দর চাঁদ ট্রাইটন নেপচুনের মতোই ঠান্ডা। ট্রাইটনের তাপমাত্রা -২৩৫° সেলসিয়াস। মাইনাস ২৩৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা সত্ত্বেও ভয়েজার-২ ট্রাইটনের পৃষ্ঠ থেকে শনি ও ইউরেনাসের চাঁদের পৃষ্ঠের মতো পানির ফোয়ার বের হতে দেখেছিল।

শনি ও ইউরেনাসের চাঁদের পৃষ্ঠের বরফের নিচে যেমন পানির বিশাল সমুদ্র রয়েছে। নেপচুনের চাঁদ ট্রাইটনের বরফ পৃষ্ঠের নিচেও সেরকম সমুদ্র থাকতে পারে। আপনি যদি ট্রাইটনের পৃষ্ঠের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে আপনি দূরে সাদা আলোয় ঝলমলে ছোট সূর্যকে দেখতে পাবেন। আপনার বাম হাত বরাবর থাকবে নীল গ্রহ নেপচুন।

আপনার ডান হাত বরাবর থাকবে কালো রংয়ের মহাকাশ। আর পায়ের নিচে থাকবে ঠান্ডা চাঁদ ট্রাইটন। ভয়েজার-২ তার যাত্রাপথে সর্বশেষ বৃহৎ ও ভারী বস্তু হিসেবে ট্রাইটনকে দেখেছিল। এখনো পর্যন্ত তার যাত্রাপথে এতবড় ও ভারী কোনো বস্তু বা গ্রহ বা উপগ্রহকে দেখেনি। ভয়েজার-২ এখন আমাদের সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে অনেক দূর চলে গেছে। লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়, তুরস্ক

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*