ম্যারাডোনার ছায়ায় বেড়ে ওঠা ছেলেটি যখন মেসির ত্রাতা

আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার যেদিন আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স ছেড়ে আসছিলেন, সেদিন ডিয়েগো ম্যারাডোনার মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে দিয়েছিলেন আবেগী এক বার্তা। সম্মান জানিয়েছিলেন সেই ক্লাবকে যে ক্লাব তাঁর পরিবারে আনন্দ এনে দিয়েছিল। তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিল ফুটবলে চলার পথটাও।

হ্যাঁ, ম্যারাডোনা যে ক্লাবের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন, সেখানেই বেড়ে উঠেছেন ম্যাক অ্যালিস্টার। ম্যারাডোনার সঙ্গে তাঁর বেশ কিছু মিলও আছে।একই শহর বুয়েন্স এইরেসে তাঁদের জন্ম। ফুটবলের শুরুটা একই ক্লাবে।

এমনকি ম্যারাডোনা নামের সমার্থক বোকা জুনিয়র্সের হয়েও কিছুদিন ধারে খেলেছিলেন ম্যাক অ্যালিস্টার, যদিও বোকার সঙ্গে শেষটা তাঁর ভালোভাবে হয়নি। ওহ, ম্যারাডোনার সঙ্গে আরও একটি যোগ আছে ম্যাক অ্যালিস্টারের। তাঁর বাবা কার্লোস জেভিয়ার অ্যালিস্টার ছিলেন ম্যারাডোনারই সতীর্থ।

ম্যাক অ্যালিস্টার যখন আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে খেলতেন ম্যারাডোনা তখন সেই ক্লাবের খোঁজ খবরও রাখতেন। সে সময় ক্লাবের খেলোয়াড়দের ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তাও দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার দুই বছর আগে পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন, নয়তো ম্যাক অ্যালিস্টারের আজকের এই উত্থানে তিনি নিশ্চিতভাবে গর্বিত হতেন। তাঁর প্রাণের ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসা ছেলেটিই যে আজ বাঁচিয়ে দিয়েছেন আর্জেন্টাইনদের আরেক সোনালি সন্তান লিওনেল মেসির স্বপ্ন।

তাঁর গোলেই আজ পৃথিবীব্যাপী কোটি আর্জেন্টাইন ভক্তের আবেগ বাঁধ ভেঙেছে। পেনাল্টি মিস করে মেসি যখন মহানায়ক থেকে খলনায়ক হওয়ার অপেক্ষায় তখনই ত্রাতা রূপে আবির্ভূত হন ম্যাক অ্যালিস্টার। তাঁর গোলটি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শুধু টিকিয়েই রাখেনি, মেসির বুক থেকে বিশাল এক পাথরও নামিয়ে দিয়েছে। যে মেসি এত দিন দুই হাতে দিয়ে আসছিলেন, সে দায় আজ কিছুটা হলেও মিটল ম্যাক অ্যালিস্টারকে দিয়ে।

লাতিন দেশে ফুটবলারদের গল্পটা বরাবরই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ের। ভাববেন না ম্যাক অ্যালিস্টারের গল্পটাও তেমনই। তাঁর গল্পটা বরং উল্টো। সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মেছিলেন এই ফুটবলার। বাবা ছিলেন ফুটবলার এবং মা ব্যবসায়ী। পরিবারে দারিদ্র্যের কোনো ছোঁয়া ছিল না। ২৪ ডিসেম্বর জন্ম দিন হওয়াতে তাঁর পরিবারে ক্রিসমাসের উৎসবটাও শুরু হতো আগে থেকে।

প্রাচুর্যের মাঝে বেড়ে ওঠার কারণেই হয়তো বাবা-মা চাননি ফুটবলের কঠিন পথে নামুক ম্যাক অ্যালিস্টার। তাঁরা চেয়েছিলেন ছেলেও পারিবারিক ব্যবসায় আসুক। তবে ম্যাক অ্যালিস্টারের রক্তে যে ফুটবলের বাস। শৈশব থেকেই পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছেন ফুটবল নামক গোলক বস্তুটিকে। মাত্র ৬ বছর বয়সেই শুরু করে দেন ফুটলের প্রশিক্ষণ। প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে দেরি করেননি। দ্রুত চলেও আসেন আলোয়।

ট্যাকনিকালি দারুণ সামর্থ্যবান এক খেলোয়াড় অ্যালিস্টার। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ভূমিকায় খেলার সময় বলে তাঁর প্রথম স্পর্শগুলোও হয় দারুণ। বলকে নিজের মতো করে কথা বলাতে পারেন এবং চোখের পলকে দিতে পারেন দারুণ সব পাস। সঙ্গে যে অবশ্য দলের প্রয়োজনে গোলও করতে পারে সে কথা নিশ্চয় এখন আর না বললেও চলছে। অ্যালিস্টার তাঁর ক্যারিয়ারের দারুণ এক সময়ও পার করছেন এখন।
আর্জেন্টিনার হয়ে অ্যালিস্টারের এমন জ্বলজ্বলে পারফরম্যান্সের কৃতিত্ব কিছুটা হলেও তার ক্লাব ব্রাইটনকে দিতে হবে। ইংলিশ এই ক্লাবের হয়েই নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন অ্যালিস্টার।

২০২০ সালে শুরুতে তাঁর অভিষেক হলেও করোনা মহামারিতে লম্বা সময় আর খেলা হয়নি। ফেরার পর একাদশে থিতু হতে জিততে হতো কোচ গ্রাহাম পটারের মন। কঠিন পরিশ্রমের ও খেলোয়াড় হিসেবে নিজের আদর্শ কার্লোস তেভেজ থেকে পাওয়া বার্তাগুলোও বুকে ধারণ করে এগিয়ে যান অ্যালিস্টার। ২০২১/২২ মৌসুমে অন্য রকম এক খেলোয়াড় হিসেবে সমানে আসেন। তাঁর পরিবর্তন চমকে দেয় পটারকেও। আর ২০২২ সালের দেখা মিলে দুর্দান্ত এক ম্যাক অ্যালিস্টারের। যার মধ্য দিয়ে প্রিমিয়ার লিগে ফিরে আসে আর্জেন্টাইন ফুটবলের সুবাসও। আর ২৩ বছর বয়সেই তাঁকে ভাবা হচ্ছে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ভবিষ্যৎ।

ভবিষ্যৎ তো অবশ্য পরের বিষয়, অ্যালিস্টারের সামনে সুযোগ বর্তমানটাকে রাঙানোর। মেসির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিশ্বজয়ের। ইতিমধ্যে মেসির পছন্দের একজনও হয়ে উঠেছেন ম্যাক অ্যালিস্টার। যদিও মেসির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে বেশ স্নায়ু উত্তেজনায় ভুগেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে অ্যালিস্টার বলেছেন, ‘বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আমি সত্যিই অনেক স্নায়ু চাপে ভুগছিলাম। তবে এটা আসলেই দারুণ ব্যাপার ছিল। আমি কখনো ভুলব না। এটা জাদুকরী ব্যাপার যে, আমার বাবা খেলেছিলেন ম্যারাডোনার সঙ্গে আর আমি মেসির সঙ্গে। এটা নিয়ে আমরা সত্যি গর্বিত।

যার সামনে স্নায়ুচাপে ভুগছিলেন সেই মেসিও আবার তাঁকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন বিব্রত হওয়ার হাত থেকে। চুলের রঙের কারণে সতীর্থরা যখন তাঁকে ‘জিনজার’ বলে খেপাত তখন মেসিই সবাইকে বলেছিলেন এই নামে না ডাকতে। সেই প্রতিদানটাই হয়তো আজ দিলেন ম্যাক অ্যালিস্টার। অবশ্য এ তো কেবল শুরু। মেসির পাশে দাঁড়িয়ে শিরোপা উদ্‌যাপনের স্বপ্নটাও হয়তো এখন দেখতে শুরু করেছেন জিনজার। ওহ, এই নামে তো আবার ডাকতে মানা!

Sharing is caring!