মোটরসাইকেলে বিধি নিষেধ এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ!

বাংলায় প্রচলিত এক প্রবাদ আছে, ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’। এই প্রবাদটির সবচেয়ে মিল রয়েছে রাজধানীর মোটরসাইকেল চালকদের সাথে। কখনো কখনো যেন মনে হয়, ঢাকার মোটরসাইকেল চালকদের জন্যই এই প্রবাদটির উৎপত্তি। কারণ দেশের যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রথম বলি হয় রাজধানীর এসকল চালকরাই।

করোনা পরিস্থিতিতে সংক্রমণ রোধে গতকাল ২৮ জুন থেকে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে দেয়া হয়েছে সীমিত আকারে লকডাউন। ১ জুলাই থেকে দেয়া হবে সর্বাত্মক লকডাউন। তবে গতকাল থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের প্রজ্ঞাপনে সকল গণপরিবহনের উপর নিষেধাজ্ঞা আনা হলেও নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে রিক্সা এবং ব্যক্তিগত যানবাহনকে।

তবে সীমিত লকডাউনে সকলকে প্রয়োজন ব্যতীত ঘরের বাইরে বের হওয়ায় নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু প্রজ্ঞাপনের তোয়াক্কা না করে গতকাল রাজধানীর রাস্তাঘাটে অসংখ্য ব্যক্তিগত যান, সিএনজি এবং রিক্সার হিড়িক দেখা গেছে। স্বাভাবিক সময়ের মতোই রাস্তার সিগন্যালগুলোতে দেখা গেছে যানজট।

কর্মস্থলে কিংবা নিজ জিন গন্তব্যে যেতে মানুষ বেছে নিচ্ছে সিএনজি রিক্সা, দ্রুত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন মোটরসাইকেল রাইড। এদিকে রাস্তাঘাটে যানবাহনের তীব্র চাপ দেখে ২৮ জুন রাতেই ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে নতুন নির্দেশনা দেয়া হয়।

নির্দেশনাটিতে শুধু মোটরসাইকেল চালকদের উপর নতুন করে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। ডিএমপির পক্ষ থেকে বলা হয়, লক্ষ্য করা যাচ্ছে, লকডাউনের মধ্যে মোটরসাইকেলে চালকের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তি রাইড শেয়ার করছেন। অথবা কেউ কেউ পেশাগত কারণেও রাইড শেয়ার করছেন।

ফলে একই হেলমেট বারবার বিভিন্ন মানুষ ব্যবহার করছেন। এতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই সংক্রমণ রোধে মোটরসাইকেলে চালক ছাড়া অন্য আরোহী বহন না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এদিকে অনুরোধের সুরে বলা হলেও আজ মঙ্গলবার (২৯ জুন) সকাল থেকেই কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।

মোটরসাইকেলে চালক ছাড়া দ্বিতীয় কেউ থাকলেই পুলিশের জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেককে। এসময় পুলিশ থেকে জানানো হয়, সরকার নির্দেশিত প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নেই কঠোর অবস্থানে রয়েছেন তারা। আইন অমান্যের অভিযোগে জরিমানা ও মামলা দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশের এমন আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ঢাকা শহরের অসংখ্য বাইক চালক। শুধু মোটরসাইকেলেই কেন করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে, সিএনজি কিংবা রিক্সায় কেন পাবেনা জানতে চেয়েছেন অনেকে। যেখানে মোটরসাইকেলের মতোই সিএনজি কিংবা রিক্সাতে একই সিটে অসংখ্য মানুষ উঠানামা করে।

এদিকে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) জারি করা নির্দেশনায় রাইড শেয়ারিং কার্যক্রম সীমিত সময়ের জন্য স্থগিত রেখেছে উবার, পাঠাও, সহজসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই মধ্যে অ্যাপস সেবা বন্ধ করে দিয়েছে তারা।

তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে যারা জীবনযাপন চালান, তারা বিপদে পড়েছেন। এদিকে অ্যাপস ছাড়া যারা বের হয়েছে তাদেরকে পড়তে হয়েছে পুলিশের বাঁধার মুখে। দিতে হচ্ছে জরিমানা। এছাড়া জরিমানার পরিমাণ একটি ভাড়ার দ্বিগুণ, কখনো কখনো আরও বেশি।

মোহাম্মদপুর আসাদগেট এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, ‘সকালে বনানী ৯ নম্বরের একটা ভাড়া পেয়েছিলাম। এখানে ট্রাফিক থামায়। ২ ঘণ্টার বেশি থামিয়ে রেখে শেষে ১০০০ টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেয়। আমি এখনও কোনো ট্রিপ (ভাড়া) পাইনি, তার উপর এই জরিমানা। সারাদিন কেমনে চলবে জানিনা।’

কুরিয়ার সার্ভিসে চাকরি করা এক কর্মী বলেন, মোটরসাইকেলে সহকর্মীকে নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাকে অনেকক্ষণ আটকে রেখে পরে ১২০০ টাকার মামলা দিয়েছে। আমি অফিসেও যেতে পারলাম না আর এখানেও মামলা খেতে হলো। সব কার্যক্রম খোলা রেখে লকডাউন দেওয়ার কোনো মানে হয় না।

এটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য কষ্ট ছাড়া আর কিছুই না।’ আরেক রাইডারের সাথে কথা হলে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘প্রাইভেটকার, স্টাফবাস, রিক্সা একাধিক যাত্রী পরিবহন করতে পারলে আমরা কেন পারব না? ‘ তিনি বলেন, ‘আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছি।

আমাদের না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। ইনকামের চেয়ে মামলার টাকাই বেশি হয়ে গেছে।’ ট্রাফিক পুলিশের ধানমন্ডি জোনের উপ-কমিশনার জাহিদুল সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘করোনা পরিস্থিতির অবনতি রোধে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব নির্দেশনা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে আমরা সেটি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

প্রজ্ঞাপনে মোটরসাইকেলে চালক ছাড়া আরোহী বহনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তারপরও নির্দেশনা অমান্য করে যারা এমনটি করছে সেসব ক্ষেত্রে আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ এদিকে বিগত সময়গুলো থেকে দেখা গেছে, যে কোন পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেলের উপর কোনো নিষেধাজ্ঞা এলেই পুলিশ কঠোর ভূমিকা পালন করে।

এর আগেও হরতাল কিংবা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেলের উপর নানারকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে দেখা গেছে। অথচ বিধিনিষেধের দ্বিতীয় দিনেও ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সকাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস দেখা না গেলেও

সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা, ভ্যান, সাধারণ রিক্সা ও প্রাইভেটকারের আধিক্য চোখে পড়েছে। অনেককে একসাথে ভ্যানে চেপে গন্তব্যে পৌঁছাতেও দেখা যায়। সেক্ষেত্রে পুলিশের নীরব ভূমিকা লক্ষ্য গেছে। এ যেন সব দোষ ‘মোটরসাইকেল ঘোষ’!

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*