মেসির মতো করে আর কেউ শিরোপা জেতেননি

এত বছরের অপেক্ষা যখন ঘুচেছে লিওনেল মেসির, এর চেয়ে দারুণভাবে হয়তো আর ঘুচতে পারত না! ১৬তম বছরে পড়তে যাওয়া আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারে বারবার হতাশাই পেয়েছিলেন, অবশেষে গতকাল হলো মেসির স্বপ্নপূরণ। কোপা আমেরিকা জিতেছেন, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর প্রথম শিরোপা।

তা-ও কীভাবে? চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে তাদেরই মাটিতে হারিয়েছেন ফাইনালে, তা-ও আবার ব্রাজিলের ফুটবলতীর্থ মারাকানায়, যে ফাইনাল প্রথমবার কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপার নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল মেসি-নেইমারকে…এ নিয়েই কাব্য কম হয়নি। কম হবেও না কখনো।

কিন্তু মেসির জাতীয় দলে প্রথম শিরোপার গল্পটা আরেকটি কারণেও অনন্য হয়ে থাকছে। শিরোপা জেতা কোনো খেলোয়াড় সেই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন, সবচেয়ে বেশি গোল বানিয়েও দিয়েছেন…ফুটবলে এত বছরে আর কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে যে এমনটা হয়নি! ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে মেসি ঠিক মেসি-সুলভ আলোকিত ছিলেন না।

ব্রাজিলের পরিকল্পনা পণ্ড করে দিতে এ ম্যাচে তাঁকে ভিন্ন ভূমিকা দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। টুর্নামেন্টজুড়ে মাঠের মাঝে থেকে দলের আক্রমণ গড়ে দেওয়ার কারিগর ছিলেন মেসি, কিন্তু কাল তাঁকে মাঝে না রেখে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের মতো রাইট উইংয়ে খেলিয়েছেন স্কালোনি। দুটি কারণ এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা হয়ে আসতে পারে।

একটি কারণ ম্যাচ শেষে জানিয়েছেন স্কালোনি নিজে—সেমিফাইনাল আর ফাইনাল দুই ম্যাচই মেসি খেলেছিলেন হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট নিয়ে। আর দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে ব্রাজিলের মাঝমাঠ ও রক্ষণের গঠন। ২০১৬ সালে তিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুর দিকে ব্রাজিলকে বেশ আক্রমণাত্মক মনে হলেও যত দিন যাচ্ছে, তিতে ব্রাজিলকে খেলাচ্ছেন আরও রক্ষণাত্মক কৌশলে।

চার ডিফেন্ডার আর দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে নিয়ে ডি-বক্সের সামনে ব্লক তৈরি করার চেষ্টা থাকে তিতের, সেখানে দুই ফুলব্যাকের ওপরে ওঠার স্বাধীনতা থাকে খুব কম। এটিরই পাল্টা দিয়েছেন স্কালোনি। মেসিকে ডান পাশে খেলিয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ, যাতে কাসেমিরো-ফ্রেডের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড জুটি দ্বিধায় পড়ে যায়।

মেসিকে আটকাতে গেলে মাঝমাঠে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়ে যাবে আর্জেন্টিনার জন্য, আবার মেসিকে শুধু লেফটব্যাক রেনান লোদির সামনে ছেড়ে দেওয়াও ভয়ংকর। তার ওপর যেখানে আর্জেন্টিনার ডান পাশে মেসির সঙ্গে আনহেল দি মারিয়াও ছিলেন।

মেসিকে ঘিরে আর্জেন্টিনার আক্রমণ রচনা না করে চোটে কিছুটা ফিটনেস হারানো মেসিকে মূলত ‘ডিকয়’ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন স্কালোনি। চোট আর স্কালোনির কৌশলের প্রভাব পড়েছে মেসির পারফরম্যান্সে। আর্জেন্টিনার আক্রমণে আগের ম্যাচগুলোর মতো উজ্জ্বল ভূমিকা রাখতে পারেননি।

এর বাইরে ভুলও করেছেন দুটি। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি তাঁর নেতৃত্বে পাল্টা আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা, কিন্তু ডি বক্সের সামনে তাঁকে তিনজন ব্রাজিলিয়ান ঘিরে ধরার সময়ে মেসির কাছে দুটি বিকল্প ছিল—বাঁ দিকে ছুটে অপেক্ষাকৃত ভালো জায়গায় বেরিয়ে যাওয়া রদ্রিগো দি পলকে পাস দেওয়া, নতুবা ডান দিকে আনহেল দি মারিয়াকে দেওয়া।

তা না করে ড্রিবলিং করতে গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান মেসি। এরপর ৮৯ মিনিটে প্রথম স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারায় গোল করার সহজ সুযোগ হারিয়েছেন। ভুলের মাশুল এবার মেসিকে দিতে হয়নি। ২২ মিনিটে আনহেল দি মারিয়ার গোলেই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা।

তবে ফাইনালে আলো ছড়াতে না পারলেও এর আগে মেসি যা করেছেন, তা-ই এই টুর্নামেন্টকে মেসির টুর্নামেন্ট বানিয়ে দিতে যথেষ্ট। টুর্নামেন্টে ৪ গোল করেছেন, যা কলম্বিয়ার লুইস দিয়াজের সঙ্গে টুর্নামেন্টে যৌথ সর্বোচ্চ। এর পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ৫টি গোলও করিয়েছেন মেসি, যেখানে টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩টি অ্যাসিস্ট নেইমারের।

টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার দৌড়ে লুইস দিয়াজ গোলের সংখ্যায় তাঁর সমতায় থাকলেও গোল করানোতে এগিয়ে থাকা মেসি সেরা গোলদাতার পুরস্কার পেয়েছেন। সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টও তাঁর। সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টে তাঁর মতো করে আর কেউ আলো ছড়াতে না পারায় সেরা খেলোয়াড়ও মেসি।

এসবের পাশাপাশি কোপা আমেরিকার শিরোপাটাও উঠেছে মেসিরই হাতে! ফুটবল এত বছরে ২১টি বিশ্বকাপ দেখেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রাচীনতম টুর্নামেন্ট কোপা আমেরিকা এবার হলো ৪৭তমবারের মতো, ১৯৬০ সালে শুরু হওয়া ইউরোর এবার ছিল ১৬তম সংস্করণ।

২০২৩ সালে এশিয়ান কাপের হবে ১৮তমবার। ওশেনিয়া অঞ্চলের টুর্নামেন্ট ওএফসি নেশনস কাপ হয়েছে ১০ বার। আফ্রিকান নেশনস কাপ হয়েছে ৩২ বার। কনক্যাকাফ গোল্ড কাপের ১৬তম আসর চলছে যুক্তরাষ্ট্রে। গোল্ড কাপে শেষ পর্যন্ত কেউ মেসির মতো কিছু করে দেখালে ভিন্ন হিসাব,

কিন্তু এর আগে ১৫৮টি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে একই খেলোয়াড়কে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়, সর্বোচ্চ গোলদাতা, সবচেয়ে বেশি গোল গড়ে দেওয়া হতে কখনো দেখা যায়নি! ১৫৯তম টুর্নামেন্ট, ৪৭তম কোপা আমেরিকায়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের ১০ম বড় টুর্নামেন্টে এসে যে কীর্তি প্রথম গড়লেন মেসি!

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*