মসজিদে আকসায় ৫শ’ বছর আজান দেওয়ার সৌভাগ্য যে পরিবারের! ((ভিডিও)

ঐতিহ্যবাহী সৌভাগ্যশালী একটি পরিবারের নাম ‘কাজ্জাজ’। সৌদি আরবের হেজাজ থেকে ১৫শ’ শতাব্দিতে ফিলিস্তিনে আসেন এ পরিবার। বর্তমানে এ পরিবারের অষ্টম পুরুষ ফিরাস আল কাজ্জাজ (৩৩) মসজিদে আকসায় মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী হওয়ায় উসমানি সাম্রাজ্যের দায়িত্বশীলরা এ পরিবারকে মসজিদে আকসার মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেন।

কাজ্জাজ পরিবারের দায়িত্ব পালন: রাতের বুক চিরে উদীয়মান সূর্য যখন জেরুজালেমের মসজিদে আকসার সোনার গম্বুজকে আলোকিত করার প্রস্তুতি নেয়, ঠিক তখনই কাজ্জাজ পরিবারের প্রতিদিনের দায়িত্ব পালন শুরু হয়। ফিরাস আল-কাজ্জাজের সম্মোহনী কণ্ঠের আহ্বানে ধীরে ধীরে শহরটি জাগ্রত হতে থাকে। সুন্দর সুললিত কণ্ঠের সম্মোহনী নরম সূরে প্রতিধ্বনিত হয়- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’।

ঐতিহ্যবাহী এ কাজ্জাজ পরিবার বংশ পরম্পরায় বিগত ৫০০ বছর ধরে মুসলমানদের প্রথম কেবলা মসজিদে আকসায় আজান দেওয়ার অনন্য দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বর্তমানে এ পরিবারের অষ্টম পুরুষ ফিরাস আল কাজ্জাজ মসজিদে আকসায় মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান মসজিদে আকসায় বিগত ৫০০ বছর ধরে আজান দেওয়া পরিবারের সর্বশেষ সদস্য ফিরাস আল কাজ্জাজ। তিনি প্রতিদিন ফজর, মাগরিব ও ইশার নামাজের আজান দেন। ফিরাস আল কাজ্জাজ প্রতিদিনের প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাজের সূর সম্পর্কেও ধারণা দেন। তিনি বলেন কাউকে দিনের শুরুতে ঘুম থেকে ওঠাতে হলে তাকে নরম ও দয়াশীল কণ্ঠে আহ্বান করতে হবে। তবেই সে নামাজের জন্য ঘুম থেকে ওঠতে উৎসাহিত হবে।

শৈশবের স্মৃতিচারণা করে ফিরাস বলেন, ‘যখন আমার বয়স ১০ বছর তখন একদিন বাবা আমাকে কুরআন তেলাওয়াত করতে বলেন। আর তখনই প্রথম নিজের সুন্দর কণ্ঠস্বর উপলব্ধি করি। সে সময় থেকে বাবা আমাকে উৎসাহ দিতে থাকেন। আর আমিও তাঁর কাছে শিখতে থাকি।’

ফিরাজ আল কাজ্জাজ সর্বপ্রথম ১২ বছর বয়সে মসজিদে আকসায় আজান দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আমার আজান শুনে মানুষ আমাকে উৎসাহ দিয়ে সামনে এগিয়ে দেয়। ফিরাস আল কাজ্জাজ বলেন- ‘সে সময় আমার এ বিষয়টি অনুভূতিতে ছিল না যে, আমি একটি বিশেষ মসজিদে আজান দিচ্ছি। আমার অনুভূতি ছিল সাধারণ কোনো মসজিদ বা স্থান এটি।

আলহামদুলিল্লাহ! অথচ আজ লক্ষাধিক মানুষের সামনে আজান কিংবা তেলাওয়াত আমাকে বিব্রতবোধ করে না।’ ফিরাস আল কাজ্জাজের ৮০ বছর বয়সী বাবা এখনও ফিরাসের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করেন। তিনি প্রতিদিন জোহর ও আসরের আজান দেন। ফিরাসের দায়িত্ব গ্রহণের আগে তার বাবা মসজিদে আকসায় একটানা ৪০ বছর আজান দিয়েছেন। এখনও কিঞ্চিত সে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তিনি।

মুসলিম উম্মাহর কাছে মসজিদে আকসা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার আসনে অবস্থান করছে। কারণ এ স্থান থেকে হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেরাজ শুরু হয়েছিল। এ পবিত্র স্থানে রয়েছে অসংখ্য নবি-রাসুলের পদচারণা। এটি মুসলিম উম্মাহর তৃতীয় পবিত্রতম স্থান।

মুসলিম ছাড়াও খ্রিস্টান ও ইয়াহুদিদের কাছেও এটি পবিত্রতম স্থান। ম’হামা’রি করো’নাভাই’রাসের লক’ডাউনেও বন্ধ থাকেনি কা’জ্জাজের কণ্ঠ। নিয়মিত শান্তির এ আহ্বান তিনি অব্যাহত রেখেছেন। সুললিত নরম কণ্ঠে মানুষকে নামাজের জন্য আহ্বান করে যাচ্ছেন তিনি।

ফিরে দেখা: কাজ্জাজ পরিবারের পূর্বপুরুষ ৫০০ বছর আগে ১৫ শতাব্দীতে সৌদি আরবের হেজাজ থেকে জেরুজালেমের মসজিদে আকসায় আসেন। সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী হওয়ায় উসমানি সাম্রাজ্যের দায়িত্বশীলরা তাঁকে মসজিদে আকসার মুয়াজ্জিন হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর থেকে বংশপরম্পরায় তাঁরা আজান দিয়ে আসছেন। ৩৩ বছর বয়সী অষ্টম পুরুষ ফিরাস আল কাজ্জাজ আল আকসা মসজিদের কনিষ্ঠতম মুয়াজ্জিন।

মূলতঃ জিকির এবং ধর্মীয় সংগীতচর্চাই সুফি ধারার এ পরিবারের অন্যতম ঐতিহ্য। মসজিদে আকসার অতীত স্মৃতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ফিরাস আল কাজ্জাজ বলেন, ‘আল আকসার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে অতীতের কোনো মিল নেই। এখানে আগে আরব বিশ্বের অনেক বড় বড় আলেম আসতেন। ইসলাম ও কুরআন দারস দিতেন তাঁরা। সুললিত সুরে কুরআন তেলাওয়াতের রীতি-নীতি ও নানা ধরনের পদ্ধতি শেখাতেন।

কিন্তু এখন ইসরায়েলি সেনাদের অবরোধের কারণে আর তাঁদের কেউ আসতে পারেন না।’ তাঁর নরম কণ্ঠ থেকে শক্ত অথচ আবেগী কথা এভাবে বেরিয়ে আসে, ‘এখানের জড় পাথরগুলো শত-সহস্র বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মসজিদে আকসা মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম আধ্যাত্মিক স্থান। এখানে এসে মুসলিমরা ইবাদত করবেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্মৃতিবিজড়িত এ ভূমি আমাদের কাছে অত্যন্ত আবেগের স্থান।মসজিদে আকসার এ শহর ছেড়ে দূরে কোথাও থাকতে পারি না।’ এ আবেগ-অনুভূতি ও ভালোবাসা থেকেই বিগত ৫০০ বছর ধরে মসজিদে আকসায় মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করে আসছেন সৌদি আরবের হিজাজ থেকে আগত ঐতিহ্যবাহী আল কাজ্জাজ পরিবার।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*