ব্যাংক হিসাব থেকে হারিয়ে গেছে বিপুল অঙ্কের টাকা

ব্যাংক আইনের ফাঁক গলিয়ে ক্রমেই হিসাবের খাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের টাকা। অবলোপন বা রাইট অফের মাধ্যমে এ সুবিধা নিচ্ছেন সুযোগ সন্ধানীরা। রাইট অফ সুবিধা সবচেয়ে বেশি নিচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) এক হাজার ৪৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা অবলোপন করে ব্যাংকগুলো। এ সময়ে আদায় হয়েছে ৭৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।


ব্যাংক ব্যবস্থায় মন্দ মানে শ্রেণিকৃত খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রেখে স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেওয়াকে ঋণ অবলোপন বা ‘রাইট অফ’ বলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। ঋণগ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হন। তবে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হিসেবে তা দেখানো হয় না।

জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণ অবলোপনের নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। আগে মামলা ছাড়া দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ অবলোপন করা যেতো। এখন তা বাড়িয়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা ছাড়াই পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপন করা যাবে। ঋণের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে মামলা খরচ বেশি হয়। সেকারণে ব্যাংকগুলোর ছোট ঋণ অবলোপনে এমন সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৩ সাল থেকে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ বছরে ব্যাংকগুলো ৬০ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা অবলোপন করেছে। এর বিপরীতে একই সময় সুদসহ আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। গেল সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিংখাতে মোট অবলোপন ৪৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা। আর অবলোপনসহ ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।



এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আছে ২৩ হাজার ২১১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এ পরিমাণ ঋণ থেকে ব্যাংকগুলো আদায় করতে সক্ষম হয়েছে পাঁচ হাজার ৩৯৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকে অবলোপনকৃত ঋণ ৬৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তাদের আদায় ৩৫৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অবলোপন ৩৫ হাজার ৪৭৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এ খাতের ব্যাংকগুলো আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ১১ হাজার ২১০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর বিদেশি ব্যাংকে এক হাজার ৪৫৬ কোটি ২ লাখ টাকা অবলোপন দাঁড়ায়। এসব ব্যাংকের আদায় ২৫৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনে অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন বেশি করেছে। তিন মাসে ৩৭৯ কোটি ৯ লাখ টাকার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করেছে ৩২৮ কোটি টাকা। অপরদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ অবলোপনের মাত্র ২ লাখ টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো এ সময়ে ঋণ অবলোপন করেছে ৩৩ কোটি টাকা। বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপনের অঙ্ক ১৭ কোটি টাকা।



এর আগে (এপ্রিল-জুন) প্রান্তিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপনের প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে ছিল। তিন মাসে ৫৪৪ কোটি ১৩ লাখ টাকার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করেছে ৭৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অপরদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ অবলোপনের অঙ্ক ৪৫৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো এ সময়ে ঋণ অবলোপন করেছে ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপনের অঙ্ক ৫৩ লাখ টাকা। এছাড়া গত বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঋণ অবলোপন হয়েছিল ৫২৯ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্প্রতি ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতির প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ঋণ অবলোপনের নতুন শিথিলতা বড় কোনো বিষয় না। ছোট ঋণ অবলোপনের জন্য এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক খাতের একটা ঝামেলা কমবে।

তিনি আরও বলেন, নতুন সিদ্ধান্তে অবলোপনকৃত ঋণ আদায় বাড়বে না। কারণ ছোটরা কিছু টাকা দিলেও বড়রা টাকা দিচ্ছে না। কিন্তু এসব প্রভাবশালীদের থেকে টাকা আদায়ে আইনি কাঠামোতেও বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোতে সুশাসন ফেরাতে হবে।

Sharing is caring!