বিপ্লবের মেশিনে প্রতি মিনিটে ১০ লিটার অক্সিজেন উৎপাদন হবে!

বগুড়ায় করোনাকালে রোগীদের অক্সিজেন দিতে যখন চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন, ঠিক তখনি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর মেশিন আবিষ্কার করেছেন যন্ত্রবিজ্ঞানী মাহমুদুন্নবী বিপ্লব। ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওই মেশিনে প্রতি মিনিটে ১০ লিটার ও প্রতি ঘণ্টায় ৬০০ লিটার অক্সিজেন উৎপাদন সম্ভব।

এ মেশিনে একসঙ্গে পাঁচজন শ্বাসকষ্টের রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব। গত জুনে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় কর্তৃক এটুআই ইনোবেশন ল্যাবে মেশিনটি প্রদর্শন করলে আয়োজকরা ভূয়সী প্রশংসা করেন। মাহমুদুন্নবী বিপ্লব আশা করেন, তার উদ্ভাবিত মেশিন প্রথম স্থান অধিকার করবে। এরপর তিনি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবেন।

জানা গেছে, মাহমুদুন্নবী বিপ্লব বগুড়ার গাবতলী উপজেলার পদ্মপাড়ার বাসিন্দা। বর্তমানে শহরের সূত্রাপুর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকেন। তিনি ১৯৯৪ সালে বগুড়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং (পাওয়ার) বিভাগ থেকে ডিপ্লোমা করেন।

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। চাকরির পাশাপাশি বগুড়া শহরের সূত্রাপুর এলাকায় কাঁকন রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং ওয়ার্কশপ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মেশিন আবিষ্কার করে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে তিনি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এসির পরিবর্তে ব্যবহারযোগ্য ডিসি ভেন্টিলেশন সিস্টেম, বন্যা পূর্ব সতর্কীকরণ যন্ত্র, বেবি ইউরিন অ্যালার্ম বেড, রোগীর শরীরে পুশ করার স্যালাইন অ্যালার্ম সিস্টেম, জলজ প্রাণীদের জন্য পানিতে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য ওয়াটার অ্যারোয়েটর, করোনা প্রতিরোধে অটোমেটিক স্যানিটাইজিং মেশিন, প্যারালাইজড রোগীর ব্যবহারের জন্য অটোমেটিক হ্যান্ড এক্সারসাইজ অন্যতম।

বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ রোগীদের নিবিড় পরিচর্যা ওয়ার্ডে (আইসিইউ) ব্যবহারের জন্য ভেন্টিলেটর মেশিন প্রস্তুত করছেন। তার বন্যা পূর্ব সতর্কীকরণ যন্ত্রটি গত ২০১৮ সালে বগুড়ায় ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলায় শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবকের পুরস্কার অর্জন করে।

যন্ত্রবিজ্ঞানী মাহমুদুন্নবী বিপ্লব জানান, করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের অক্সিজেন সংকটের কথা ভেবে তিনি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর মেশিন আবিষ্কারের উদ্যোগ নেন। প্রায় এক মাস সময়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তিনি মেশিনটি আবিষ্কার করেন। এর নাম দিয়েছেন কেআর. অক্সিজেন কনসেনট্রেটর।

এ মেশিনে প্রতি মিনিটে ১০ লিটার ও প্রতি ঘণ্টায় ৬০০ লিটার অক্সিজেন উৎপন্ন করা যাবে। ৬০০ লিটার অক্সিজেন উৎপাদনে প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ খরচ হবে মাত্র তিন টাকার। অর্থাৎ প্রতি লিটার অক্সিজেন তৈরিতে তার ব্যয় হবে মাত্র পাঁচ পয়সা। এ মেশিনে এক সঙ্গে শ্বাসকষ্টের পাঁচজন রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব। মেশিনের আকার বৃদ্ধি করলে এক সঙ্গে ১০০ থেকে ২০০ রোগী অক্সিজেন পাবেন।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এ টু আই ইনোভেশন ল্যাবে অক্সিজেন উৎপাদন মেশিন প্রদর্শনের আহবান জানানো হয়। গত ১৭ জুন প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে তার মেশিনসহ ছয়টি মেশিন প্রদর্শন করা হয়। তবে আয়োজকরা তার মেশিনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

মাহমুদুন্নবী বিপ্লব তার অক্সিজেন কনসেনট্রেটর মেশিনের কার্যকারিতা সম্পর্কে বলেন, বেশ কিছু উপাদান দিয়ে তৈরি মেশিনটি বাতাস থেকে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেন উৎপাদনে সক্ষম। প্রথমে প্রাকৃতিক বাতাস গ্রহণ করে। এরপর মনিটরিং সিস্টেমের সাহায্যে বাতাসের মাঝ থেকে নাইট্রোজন ও অক্সিজেনকে আলাদা করে। জিওলাইট কেমিক্যাল ব্যবহার করে নাইট্রোজেন আলাদা করার পর বাতাসে ছেড়ে দিয়ে অক্সিজেন সংগ্রহ করে। পরে সেই অক্সিজেনকে কাজে লাগানো হয়।

তিনি জানান, মেশিনের আকারের ওপর জিওলাইটের পরিমাণ নির্ভর করে। তার মেশিনের জন্য তিনি দুই লিটার জিওলাইট ব্যবহার করেন। মাহমুদুন্নবী বিপ্লব আশা করেন, তার উদ্ভাবিত মেশিনটি প্রথম স্থান অধিকার করবে। আর তিনি তার উদ্ভাবিত মেশিন দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যাবেন। এ ব্যাপারে তিনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা চান।

মাহমুদুন্নবী বিপ্লবের উদ্ভাবিত অক্সিজেন কনসেনট্রেটর মেশিন সম্পর্কে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মিজানুর রহমান বলেন, মেশিনটি রোগীদের শরীরে অক্সিজেন সরবরাহের ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর হবে।

তিনি বলেন, মানুষের অক্সিজেন স্যাচুরেশন যদি নেমে ৯০ এর কাছাকাছি বা ৯৫ এর নিচে আসে তখন অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। ৮০ শতাংশ স্যাটারেশনেও এ অক্সিজেন কনসেনট্রেটর মেশিন সাপোর্ট দিতে পারবে। তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তির অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৫ থেকে ৯০ শতাংশে নেমে এলে তখন তার প্রতি মিনিটি এক লিটার অক্সিজেন লাগে। সেক্ষেত্রে এ মেশিন দিয়ে একসঙ্গে একাধিক ব্যক্তিকে অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হবে।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*