পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দরকষাকষি

বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন অংশগ্রহণ করবে না এবং সে নির্বাচন হতেও দেওয়া হবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে সেই রোডম্যাপেও সায় দেয়নি বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রকাশ্য বক্তব্য আর পর্দার আড়ালের বক্তব্য এক নয়। বিএনপি বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশের মত কর্মসূচিগুলো পালন করছে আসলে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য। কিন্তু পর্দার আড়ালে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে, আলাপ-আলোচনা করছেন। সরকারের সূত্রগুলো বলছে, এই আলাপ-আলোচনা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে।

আলাপ-আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো আগামী নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয় এবং বিএনপি যেন নির্বাচনে আসে। এই আলোচনায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি মোটেও নেই। বরং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইরে কিভাবে একটি পরিবেশ তৈরি করা যায় যে পরিবেশে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে সেটি আলাপ-আলোচনা করা হচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য পাঁচটি শর্ত দেয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই পাঁচটি শর্ত নিয়েই আসলে দরকষাকষি চলছে।

এই পাঁচটি শর্তের মধ্যে প্রথম শর্ত হলো বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করতে হবে এবং তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে দিতে হবে। দ্বিতীয় শর্ত হলো, নির্বাচনের আগে যে সরকার গঠিত হবে সেই সরকার একটি জাতীয় সরকারের আদলে হতে হবে এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সংসদের সব দলগুলোর অংশগ্রহণে একটি মন্ত্রিসভা গঠন, সেরকম একটি মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে।

সেখানে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্রসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় দিতে হবে। ওই মন্ত্রিসভা গঠনের ব্যাপারে বিএনপির বক্তব্য হলো, সংসদের আসনের আনুপাতিক হারে নয় বরং সরকার এবং বিরোধী দলের সমানুপাতিক হারে মন্ত্রিসভার সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ বিএনপি বা বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা যতই থাকুক না কেন, তাকে অর্ধেক আসন দিতে হবে। বিএনপির চতুর্থ দাবি হলো, বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো রয়েছে সেই মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে এবং পঞ্চম দাবী হলো, অন্তত ১০০টি আসনে বিএনপির বিজয়ের গ্যারান্টি দিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারের বিভিন্ন মহল বিএনপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলছেন এবং বিএনপির পক্ষ থেকে এই ধরনের দরকষাকষির গোপন বৈঠক গুলোতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপির পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে প্রথম দাবির ব্যাপারে সরকার ইতিবাচক বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। সরকার মনে করছে, বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় তাহলে বেগম জিয়ার ব্যাপারে তারা ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচনকালীন সময়ে সকল দলের অংশগ্রহণে যে মন্ত্রিসভা গঠন সে ব্যাপারেও আওয়ামী লীগের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন যে, সমানুপাতিক হারে নয় বরং সংসদের আসনের ভিত্তিতে বিরোধী দলকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া যেতে পারে। তবে বাকি দাবিগুলোর ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি, তবে আলাপ-আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের নেতারাও বলছেন যে, এই আলাপ-আলোচনা কেবল শুরু হয়েছে, দীর্ঘদিন আলাপ-আলোচনা চলবে। এই আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকার এবং বিরোধী দল একটি সমঝোতার জায়গায় যাবে। সরকার এখনও মনে করছে আগামী নির্বাচনে অবশ্যই বিরোধী দল অংশগ্রহণ করবে এবং এই আলোচনার সূত্র ধরেই শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় তারা পৌঁছবে। কোনো কোনো সূত্র বলছে যে, কূটনৈতিক মহলও আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এক জায়গায় নিয়ে আসার জন্য এই সমঝোতায় তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কাজ করছে। তবে এই সংলাপ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এই সংলাপের ধারা চূড়ান্ত হতে আরও সময় লাগবে।

Sharing is caring!