দেশের যে মেলায় খুঁজে নিতে পারেন পছন্দের জীবনসঙ্গী

প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে গত বুধবার (৫ অক্টোবর) শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয়া দুর্গাপূজা। তবে এখনও কাটেনি উৎসবের রেশ। এখনও বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা রাখা হয়েছে। যেটিকে ঘিরে বসেছে মেলা। এরই মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী মেলা বসেছে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায়। যে মেলায় সমাগম হয় অধিকাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের। মেলার আয়োজনও করেন এসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যরা।

এই মেলাটি সাধারণত বসে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের আত্মীয়-স্বজনদের মিলনমেলা হিসেবে। তবে মেলার আরেকটি আকর্ষণ হলো, আদিবাসী ছেলে-মেয়েরা এখান থেকে পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পারেন। এখানে কোনও পাত্র বা পাত্রী পছন্দ হলে পরিবারকে জানিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতেই এই মেলার আয়োজন।

বীরগঞ্জ উপজেলার ১১নং মরিচা ইউনিয়নের গোলাপগঞ্জ বাজারে অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজা। আর এর আশপাশের এলাকাজুড়েই মেলা বসলেও মূল মেলা বসে পার্শ্ববর্তী গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মেলায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষের উপচেপড়া ভিড়। মেলাকে ঘিরে বসেছে বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও মিষ্টির দোকান। একপাশে বসেছে নাগর দোলা। আছে মাটির তৈরি খেলনার দোকানও। আদিবাসী কিশোরী ও তরুণীরা এসেছেন সেজেগুজে। কপালে টিপ, মাথায় ফুলের তোড়া, হাতে ফুলের তোড়া, লিপস্টিক, খোপায় গাজরা, হাতে চুড়ি, গলায় নানান রকমের মালা দিয়ে এসেছেন তারা। ছেলেরাও এসেছেন সুদর্শন হয়ে।

মেলায় আসা নরেন কিসকু বলেন, এটা আমাদের জন্য এক মিলন মেলা। শুধু আশপাশেরই না, দূরদূরান্ত থেকেও আত্মীয়-স্বজনরা আসেন। এই সময়টাতে আমাদের বাড়িগুলোতে আত্মীয়-স্বজনে ভর্তি থাকে। তাদের সবার সঙ্গে দেখা হয়, কুশল বিনিময় হয়। আবার আমাদের সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা তাদের মনের মানুষও খুঁজে নেয়।

মেলায় আসা রবিন ও হরেন মার্ডি হেসে হেসে বলেন, এই মেলায় পছন্দের পাত্র-পাত্রী খোঁজা হয়। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে পছন্দের পাত্রী খুঁজছি। যদি ভালো পাত্রী পাই তাহলে বন্ধুর জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেবো। মেলাটি আমাদের কাছে এই কারণে একটু বেশিই আকর্ষণীয়।

বাবু রাম সরেন নামে এক যুবক বলেন, এই মেলায় অনেক দিন ধরেই আসি। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মেলায় আমাদের সম্প্রদায়ের মিলন মেলা বসে। এখানে যারা আসেন তাদের অধিকাংশই আমাদের সম্প্রদায়ের। অর্থাৎ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর। অনেকদিন ধরেই এই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমি ছোট বেলা থেকেই এই মেলা দেখছি। মেলাতে পছন্দ করে অনেক ছেলে-মেয়েরই বিয়ে হয়েছে। বিষয়টি আমাদের কাছেও বেশ ভালো লাগে।

লুইস কিসকু নামে এক ব্যক্তি বলেন, এই মেলার জন্য আমরা অপেক্ষায় থাকি। মেলাতে দেখা হয় সেসব আত্মীয়দের সঙ্গে অনেক বছরেও দেখা হয় না। এই মেলায় আমাদের অনেক আনন্দ হয়। সব আমাদের সম্প্রদায়কে ঘিরে। এগুলো এই মেলাতে এলেই দেখা যায়। তাছাড়া দেখা পাওয়া যায় না।

লদীকি টুডু নামে এক নারী বলেন, মেলায় বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি। অনেক কিছু খেলাম, আনন্দ করলাম। পূজার পর প্রতি বছর মেলাটি বসে। অনেক আনন্দের মধ্যে দিয়ে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আবার শেষ হলে মন খারাপ হয়। বেঁচে থাকলে আবার আসবো। এই মেলা আমাদের সংস্কৃতির গানের আসর বসে। নাচ গান হয়, খুবই ভালো লাগে।

মেলার আয়োজক কমিটির সদস্য শীতল মার্ডি বলেন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতেই এই মেলার আয়োজন করা হয়। আমি ছোট থেকেই এই মেলা দেখে আসছি। পরে কমিটিতে যোগদান করি। এই মেলার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই মেলায় আমাদের সম্প্রদায়ের ছেলেরা তাদের পছন্দ মতো মেয়েকে এবং মেয়েরা তাদের পছন্দ মতো ছেলেকে খুঁজতে আসে। পছন্দ হলে পরে পরিবারকে জানিয়ে বিয়ে হয়। এই মেলা দুর্গাপূজার পরই অনুষ্ঠিত হয়। সবমিলিয়ে ভালো একটি আয়োজন।

Sharing is caring!