ঢাকার অধিকাংশ আসনেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইতিমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। সারাদেশে শুরু হয়েছে জরিপ এবং প্রার্থীদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ। এ কাজ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগরীকে একটি সংকটাপন্ন জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে মাঠ জরিপে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগরীর নির্বাচনী এলাকাগুলোতে হতশ্রী অবস্থার কথা পাওয়া গেছে।

ঢাকা মহানগরীতে মোট ১৫টি নির্বাচনী আসন রয়েছে। এই ১৫টি আসনের মধ্যে দুটি জাতীয় পার্টির কাছে, একটি ওয়ার্কার্স পার্টির কাছে আওয়ামী লীগ দিয়েছিলো। আগামী নির্বাচনে এই তিনটি আসনে অন্য কাউকে দেয়া হবে কিনা বা জাতীয় পার্টিকে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেছেন যে, এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামা হচ্ছে, সেখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীই খোঁজা হচ্ছে।

ঢাকা-৪ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সৈয়দ আবু হোসেনের এলাকায় অবস্থান তলানিতে। তবে যেহেতু তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশে জাতীয় পার্টির সঙ্গে যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে তাহলে অন্যরকম হিসেবে এ আসনে, না হলে আওয়ামী লীগ এখানে একজন যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে বের করবেন। ঢাকা-৫ আসনের মূল প্রার্থী ছিলেন হাবিবুর রহমান মোল্লা। তিনি মারা যাওয়ার পর এখানে ২০২০ সালের ১৭ অক্টোবর উপনির্বাচন হয়। উপনির্বাচনে কাজী মনিরুল ইসলাম মনুকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয় কিন্তু তিনি এলাকায় তেমন কোনো ইতিবাচক ভাবমূর্তি এখনো পর্যন্ত গড়ে তুলতে পারেনি বলেই আওয়ামী লীগের তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। ঢাকা-৬ আসনটি কাজী ফিরোজ রশীদকে দেওয়া হয়েছিলো।

এটিও যেহেতু জাতীয় পার্টিকে দেওয়া আসন সেহেতু এই আসনের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জোট বিন্যাসের পরপর। ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী সেলিম। কিন্তু তিনি এবার আর সর্বোচ্চ আদালতকর্তৃক দুর্নীতির দায়ে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর অযোগ্যতা নিয়ে কোনো রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়াটা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে এবং আইনগত বাধ্যবাধকতা কারণে তিনি নির্বাচন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। ঢাকা-৮ আসনটি আওয়ামী লীগ ১৪ দলীয় জোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননকে দিয়েছিলো। রাশেদ খান মেনন আগামী নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটে থাকুক না থাকুক, এই আসনে তিনি মনোনয়ন পাচ্ছে না এটি মোটামুটি নিশ্চিত।

এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা এবং অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। ঢাকা-৯ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি এলাকায় তার ইমেজ ধরে রেখেছেন এবং তিনি আরেকবার প্রার্থী হতে পারেন এমন সম্ভাবনাই প্রবল। আওয়ামী লীগের জন্য স্পর্শকাতর আসন হলো ঢাকা-১০। এই আসনে আওয়ামী লীগ শেখ ফজলে নূর তাপস তিনবার নির্বাচন করেছেন। তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হয়ে যাওয়ার পর এই আসনে গার্মেন্টস ব্যবসায়ী শফিউল আলম মহিউদ্দিনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। ২১ শে মার্চ ২০২০ সালে তিনি এখানে নির্বাচিত হন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি আসলে তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে পেরেছেন বা জনগণের মধ্যে রেখাপাত করতে পেরেছেন বলে আওয়ামী লীগ মনে করে না, এই আসনে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। একেএম রহমত উল্লাহ এখন ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। তিনি ঢাকা-১১ আসনের এমপি হলেও তার কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত এবং সীমাবদ্ধতা বলে আওয়ামী লীগের তথ্যানুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকা-১২ আসনের এমপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তিনি এলাকায় জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন। আগামী নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন প্রাপ্তি মোটামুটি নিশ্চিত। ঢাকা-১৩ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি সাদেক খান। গত নির্বাচনে জাহাঙ্গীর কবির নানককে বাদ দিয়ে তাকে নির্বাচিত করা হয়েছিলো। কিন্তু সাদেক খান কতটুকু সাফল্যের সঙ্গে তার নির্বাচনী এলাকা সামলাতে পারছে এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। আগামী নির্বাচনে তিনি যদি মনোনয়ন না পান তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ঢাকা-১৪ আসনে আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থী ছিলেন আসলামুল হক।

কিন্তু তাঁর আকর্ষিক মৃত্যুর পর আগা খান মিন্টু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়েছেন। কিন্তু এলাকায় তাঁর অবস্থান সংহত নয়। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই আসনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। ঢাকা-১৫ আসনে কামাল আহমেদ মজুমদার এলাকায় তার অবস্থান ধরে রেখেছেন এবং তিনি আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকা-১৬ আসনে ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লারও এলাকায় অবস্থান সংহত। তিনি আগামী নির্বাচনে কোনো রকম বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটলে মনোনয়ন পাবেন বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সুযোগ মনে করেন।

চিত্রনায়ক ফারুককে ঢাকা-১৭ আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তিনি অসুস্থ। এখনো তিনি চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে রয়েছেন। ফারুকের আসনটি পরিবর্তন হওয়া অনিবার্য এবং এই আসনে আওয়ামী লীগ কোনো হেভিওয়েট প্রার্থী দেয়ার কথা ভাবছে। ঢাকা-১৮ আসন থেকে কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী সাহারা খাতুনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু তার মৃত্যুর পর মো. হাবিব হাসানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

এখানেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী পরিবর্তন করতে পারে এবং কোনো হেভিওয়েট প্রার্থীকে নির্বাচনে দাঁড় করাতে পারে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সূত্রগুলো বলছে, একটা সময় ছিল আওয়ামী লীগ বিএনপি দুটি দলই ঢাকায় হেভিওয়েট প্রার্থী দিত। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে দু’টি দলই সরে এসেছে। তবে এবার নির্বাচনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে ঢাকার আসনে চমক হিসেবে দেখা যেতে পারে বলে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র আভাস দিয়েছে।

Sharing is caring!