ড. কামালের সঙ্গে সাইয়িদ-মন্টুর দ্বন্দ্ব চরমে!

গণফোরামের গৃহবিবাদ একাদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় থেকেই। নির্বাচনের সময় ও পরবর্তীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্ব দেওয়া ড. কামাল হোসেনের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। এ নিয়ে দলটির নেতারা ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। ক্ষো’ভের আগুন ঘি ঢালে দলটির সবশেষ কাউন্সিল।

ওই কাউন্সিলে মোস্তফা মহসীন মন্টুকে সরিয়ে দিয়ে সাধারণ সম্পাদক পদে বসানো হয় ড. কামালের আস্থাভাজন ড. রেজা কিবরিয়াকে। সবে দলে যোগ দেওয়া বয়সে নবীন এই নেতাকে গণফোরামের শীর্ষ দুই পদের একটিতে মেনে নিতে পারেননি জ্যেষ্ঠ নেতারা। তারা ড. কামালকে এজন্য দায়ী করে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।

ড. কামাল এতে কর্ণপাত না করায় এক অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে থাকেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। পরে দলটিতে বহিষ্কার ও পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে কমিটি ভেঙে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন ড. কামাল। একপর্যায়ে সব বিভেদ ভুলে এক কাতারে চলার ঘোষণা দেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। বিরোধীরা ড. কামালের নেতৃত্বে গণফোরামকে এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন।

এর পর আবারও অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কিছুদিন আগে দলের সাধারণ সম্পাদক রেজা কিবরিয়া গণফোরাম ছাড়ার ঘোষণা দেন। ওই সিদ্ধান্তের পর দলটির নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ভেবেছিল হয়তো সংগঠনে ঐক্য ফিরবে। সেই আশায গুড়েববালি। এবার দলের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন যাকে সংগঠনের নিউক্লিয়াস ভাবা হয় তার ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন তোলেছেন নেতাকর্মীদের একাংশ।

তাকে সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করেছেন জ্যেষ্ঠ নেতারা। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে গণফোরামের একটি বর্ধিত সভা হয়। এই সভায় ছিলেন না দলের প্রতিষ্ঠাতা ড. কামাল হোসেন। সভাপতিত্ব করেন দলটির নির্বাহী সভাপতি ড. আবু সাইয়্যিদ।

এদিন দলটির শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ এবার সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বের প্রতি। তাকে বাদ দিয়েই নতুন করে দলটিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু ও একাদশ নির্বাচনের আগে গণফোরামে যোগ দেওয়া ড. আবু সাইয়্যিদ।

আরও রয়েছেন আরেক নির্বাহী সদস্য সুব্রত চৌধুরী। বর্ধিত সভা থেকে ড. কামাল হোসেনকে গণফোরামের সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয় বর্ধিত সভা থেকে তিনটি কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে আগামী ২৮ ও ২৯ মে ঢাকায় দুদিনব্যাপী গণফোরামের কাউন্সিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়।

বর্ধিত সভায় ২১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি, গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদকে আহ্বায়ক করে ১০১ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং মোস্তফা মহসিন মন্টুকে আহ্বায়ক করে ২০১ সদস্যের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটিও গঠন করা হয়।

গণফোরামের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত স্টিয়ারিং কমিটিতে বিবদমান দুই অংশের নেতাদের রাখা হলেও অপরাংশ তাদের এ তালিকা মানতে নারাজ। ঘোষিত কমিটির সদস্যরা হলেন-মোস্তফা মোহসীন মন্টু, অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, মোকাব্বির খান, এমপি, জগলুল হায়দার আফ্রিক,

জামাল উদ্দিন আহমেদ, মহসিন রশিদ, আ ও ম শফিকউল্লাহ, মহিউদ্দিন কাদের, মোশতাক আহমদ, অ্যাডভোকেট সেলিম আকবর, আইয়ুব খান ফারুক, খান সিদ্দিকুর রহমান, হাসিব চৌধুরী, অ্যাড. মো. হেলাল উদ্দিন, আব্দুল বাতেন খান, আতাউর রহমান, অ্যাড. আব্দুর রহমান জাহাঙ্গীর, লতিফুল বারী হামিম, সাইদুর রহমান, মুহাম্মদ রওশন ইয়াজদানী।

এই কমিটি মানতে নারাজ দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির খান। তিনি বলেন, আমি তো এই কমিটিতে (স্টিয়ারিং) থাকবো না। এ ধরনের কমিটি করার কোনো অধিকার নেই। নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও শৃঙ্খলাপরিপন্থী ও অগণতান্ত্রিক। এটা নিয়ে দলের বৈঠকে আমরা আলোচনা করব।

বর্ধিত সভায় শোক প্রস্তাব পাঠ করেন অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও ত্রাণ কার্যক্রমের রিপোর্ট উপস্থাপন করেন অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক। একাংশের নেতা লতিফুল বারী জানান, সারা দেশের ৫৬ জেলা থেকে ২৮১ জন প্রতিনিধি বর্ধিত সভায় অংশ নিয়েছেন।

এর আগে বর্ধিত সভায় দলটির সাবেক নির্বাহী কমিটির সদস্য মহসিন রশিদ ড. কামাল হোসেনকে গণফোরামের সভাপতি পদ থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, দলের মধ্যে আজ অনেক বিভাজন চলছে। এই বিভাজন বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে সভাপতির পদ থেকে ড. কামাল হোসেনকে বাদ দেওয়া উচিত। কমিটির সাবেক সদস্য সত্তার পাঠানও একই প্রস্তাব করেন।

পরে জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও এই প্রস্তাব সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন। বিশ্বজিৎ গাঙ্গুলি বলেন, ‘ড. কামাল হোসেনকে অদৃশ্য একটি সুতা টেনে ধরেছে। ফলে গণফোরাম পেছনের দিকে ছুটছে। সামনে আর এগোতে পারেনি। তাই সময় এসেছে সুতা কেটে দেওয়ার। সুতাটি কেটে দিন গণফেরাম সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।’

বর্ধিত সভা শেষে দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে মহসিন মন্টু বলেন, গণফোরামের আগামী কাউন্সিলে কাউন্সিলররা সিদ্ধান্ত নেবেন ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি হিসেবে রাখা হবে কিনা। তিনি বলেন, আগামী কাউন্সিলে পরবর্তী নেতৃত্ব ঠিক করা হবে। সভাপতির পদ থেকে ড. কামাল হোসেনকে অপসারণ প্রসঙ্গে মোস্তফা মহসিন মন্টু আরও বলেন, গণফোরাম গণতান্ত্রিক দল। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র আনতে হলে দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

ড. কামাল হোসেনকে সভাপতি বানিয়েছিলেন কাউন্সিলররা। আগামী কাউন্সিলে তারাই (কাউন্সিলর) সিদ্ধান্ত নেবেন দলটির পরবর্তী সভাপতি কে হবেন। এ সময় বর্তমান সরকারের পদত্যাগ দাবি করে তিনি বলেন, আমরা নতুন নির্বাচন দাবি করছি। সরকারবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করেছে।

নতুন নির্বাচন না দিলে স্বৈরাচারী এ সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক আবু সাইয়িদ বলেন, দেশে আজ আইনের শাসন নেই, সাংবিধানিক শাসন নেই। যে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, আজ সে বৈষম্যের কশাঘাতে মানুষ দিশেহারা।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*