ডি ভিলিয়ার্সকে বিশ্বকাপ দলে না নেওয়ার ব্যাখা দিলেন সাবেক নির্বাচক

২০১৮ সালের ২৩ মে গোটা ক্রিকেট বিশ্বকে চমকে দিয়ে মাত্র ৩৪ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। অন্য অনেক ক্রিকেটারের মতো বেছে বেছে ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট থেকে না সরে, একসঙ্গেই বিদায় নিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। কারণ হিসেবে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কথাই বলেছিলেন তখন।

চমক তখনো বাকি ছিল। ২০১৯ বিশ্বকাপের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার দল ঘোষণা করার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ভিলিয়ার্স তৎকালীন অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসির কাছে দলে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। অধিনায়ক ডু প্লেসি এ বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার প্রধান নির্বাচক লিন্ডা জোন্ডির সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন।

কিন্তু জোন্ডি এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের সোশ্যাল জাস্টিস এবং জাতিগঠন কমিটির সঙ্গে তাঁর সময়ে হওয়া বিভিন্ন খেলোয়াড় নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় এ নিয়ে কথা বলেন জোন্ডি।

ডি ভিলিয়ার্সের ২০১৯ বিশ্বকাপে ফেরার সে প্রস্তাবের ব্যাপারে বলেন, ‘২০১৭ সালে টেস্ট ক্রিকেট থেকে সাময়িক বিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমাকে জানাননি তিনি (ডি ভিলিয়ার্স)। আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং বলি যে তাঁর এ সিদ্ধান্ত আমার ভালো লাগেনি। তখন আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন।

এরপর ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ চলে এল। তখন তো বড় এক খবর সৃষ্টি হলো। ডু প্লেসি আমাকে জানালো যে এবি বিশ্বকাপের জন্য দলে ফিরতে চান। কিন্তু আমি তখন এই প্রস্তাবে রাজি হইনি।’

এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন জোন্ডি, ‘২০১৮ সালে যখন আমাকে জানালেন অবসর নিতে চান, আমি তাঁকে বলি ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ২০১৯ বিশ্বকাপের তাঁকে আমাদের খুব দরকার। বিশ্বকাপের আগে যদি কয়েকটি সিরিজ না–ও খেলতে চান, সেটি বিবেচনা করা হবে বলে জানিয়েছিলাম।

আমি এ–ও বলি যে যদি বেছে বেছে খেলতেও চান, কোনো আপত্তি নেই এবং অবসরের ঘোষণাটা ২০১৯ বিশ্বকাপের পর যেন দেন। কিন্তু ডি ভিলিয়ার্স জানিয়ে দেন, তখনই অবসর নিতে চান। তাই ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে যখন আমাকে জানানো হলো তিনি ফিরতে চান, আমি তখন এতে সায় দিইনি, কারণ এতে দক্ষিণ আফ্রিকা দলে যারা খেলছিল তাদের সঙ্গে অবিচার করা হতো।’

ডি ভিলিয়ার্সের আলোচনায় ক্রিকেটার খায়া জন্ডোর প্রসঙ্গও চলে এসেছে। ২০১৫ সালে ভারত সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা একাদশে তখন যার জায়গা না পাওয়া আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। জোন্ডির আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে দক্ষিণ আফ্রিকার দল নির্বাচন করা কতটা কঠিন ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার আরেক নির্বাচক হুসাইন মানাক তো শুনানির সময় দাবি করে বসেছিলেন ভারতের বিপক্ষে এক ওয়ানডেতে ডি ভিলিয়ার্সই জন্ডোকে দলে রাখতে দেননি।

দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট দল নির্বাচনে বর্ণবাদী আচরণ হচ্ছে এমন অভিযোগে এই বছর দক্ষিণ আফ্রিকার সোশ্যাল জাস্টিস এবং জাতিগঠন আদালত শুনানি হয় যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে হাজির হন।

ভারত সফরে জোন্ডি দক্ষিণ আফ্রিকা দলের সঙ্গে ছিলেন না বলে জানান, ‘আমি তখন দলের সঙ্গে ছিলাম না। এ কারণে দলের সঙ্গে যে নির্বাচক ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। আমার এটা জেনে ভালো লেগেছে যে মানাক শুনানিতে তাঁর ওপর দল নির্বাচনের সময় ভিলিয়ার্স যে চাপ দিয়েছিলেন তা সে জানিয়েছে। আমি তখনই হুসাইনকে জানিয়েছিলাম যে জন্ডোকে দলে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমার মোটেও পছন্দ হয়নি।’

লিন্ডা জোন্ডি সে ঘটনার আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘হুসেইন আগের রাতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায় যে ডুমিনি চোটগ্রস্ত। ফলে আমাদের ওর পরিবর্তে কাউকে নিতে হবে। পাশাপাশি ডেভিড মিলারও তখন ফর্ম হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে আমাদের প্রথম কাজ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে একজন বদলি খেলোয়াড়কে পাঠানো।

কারণ, খায়া খেললেও আমাদের বিকল্প একজনকে রাখতেই হতো। আমরা এই বিষয়কে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিলাম, কারণ এটা তেমন কঠিন কোনো সমস্যা ছিল না। খায়াকে দলে নিতেই হতো কারণ সে এর আগেও ভারতে খেলেছে, সে ফর্মে ছিল, পাশাপাশি সে একজন ব্যাটসম্যান এবং আমাদের একজন ব্যাটসম্যানই লাগবে।

ফলে খায়াকে যে খেলানো লাগবে, এটা বোঝার জন্য কারোরই মাথা খাটানো লাগত না। তাই হুসেইনকে জানিয়ে দেওয়া হয় খায়াই খেলবে। কিন্তু আমি পরদিন টিভি চালু করে দেখি খায়া দলে নেই!

এ ব্যাপারে হুসেইন মানাকের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের কথা এখনো খেয়াল আছে জোন্ডির, ‘মানাক আমাকে জানায় খায়াকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ভিলিয়ার্সের ভালো লাগেনি। সে বুঝতে পারে যে ভিলিয়ার্স তাকে কোণঠাসা করেছে। ডি ভিলিয়ার্সের মতে অভিজ্ঞতার কারণে ডিন এলগারের খেলা উচিত এবং হুসেইন হাল ছেড়ে দেয়।

কিন্তু এরপর এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা আমাকে আর জানায়নি। ভিলিয়ার্স জানতেন আমি দলের প্রধান নির্বাচক, ফলে অধিনায়ক হিসেবে তাঁর যদি দল নির্বাচন নিয়ে কোনো অসন্তুষ্টি থাকে, সেটা নিয়মানুযায়ী আমাকে তাঁর জানানোর কথা।

তখন দলের সঙ্গে বোর্ডের প্রধান নির্বাহী হারুণ লরগাত ছিলেন, তিনিও ডি ভিলিয়ার্সের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু প্রধান নির্বাহী বা অধিনায়ক, কেউই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। ফলে দল যখন দেশে ফিরে এল, আমি তখন সব নিয়ম মানা হচ্ছে এটা নিশ্চিত করলাম এবং খায়া পরের সিরিজে খেলেছে।

মানাকের অভিযগের পর এ বিষয়ে ক্রিকইনফো গত আগস্টে ভিলিয়ার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। এ ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেননি সাবেক অধিনায়ক, ‘এত বছর পর ওই নির্বাচনের বিষয় নিয়ে কথা বলাটা বেশ কঠিন। তবে আমি নির্দ্বিধায় এটি বলতে পারি যে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি যা করেছিলাম, তা দলের ভালোর জন্যই করেছিলাম।’

তখন দলে সুযোগ না পাওয়া খায়া জোন্ডোও মনে করেন না, এই ঘটনার পেছনে ভিলিয়ার্সের কোনো বর্ণবাদী চিন্তা ছিল, ‘আমার কখনো মনে হয়নি যে আমার গায়ের রংয়ের জন্য ভিলিয়ার্স আমাকে ছোট করে দেখছে।দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ১১৪টি টেস্ট, ২২৮টি ওয়ানডে এবং ৭৮ টি-টোয়েন্টি খেলা এবিডি ভিলিয়ার্স আর জাতীয় দলে ফেরেননি।

Sharing is caring!

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*